মোঃ জহিরুল ইসলাম : আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। এরই মধ্যে রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ—দুই অংশেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ স্পষ্ট। পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, মাইকিং আর কর্মীদের দৌড়ঝাঁপে প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে নগরের চেনা দৃশ্য। অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক—সবখানেই নির্বাচনী রঙ। এই আবহে রাজধানীর অন্যতম আলোচিত ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ আসনে পরিণত হয়েছে ঢাকা–১০ সংসদীয় এলাকা। দিন যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে এই আসন ঘিরে রাজনৈতিক কৌতূহল, জল্পনা ও অঙ্ক কষা।
এই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকা। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকা একটি বড় অংশের ভোটারদের প্রত্যাশা—ধানমন্ডি এলাকাসহ ঢাকা–১০ আসনে যেন এবার ফ্যাসিবাদবিরোধী একজন প্রার্থী নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক ইতিহাস, প্রতীকী গুরুত্ব ও অতীত স্মৃতির কারণে ধানমন্ডির এই অংশকে ঘিরে আবেগ, ক্ষোভ ও প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে ঢাকা–১০-এর নির্বাচন এবার আলাদা মাত্রা পেয়েছে।
ঢাকা–১০ আসন গঠিত হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ২২ ও ৫৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে। এই আসনের আওতায় রয়েছে ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, কলাবাগান, হাজারীবাগ থানা এবং কামরাঙ্গীরচরের কিছু অংশ। এই আসনে মোট ভোটার ৩,৮৮,৬৬০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২,০৪,৬০৪, নারী ১,৮৪,০৫০ ও হিজড়া ভোটার ৬ জন। অভিজাত আবাসিক এলাকা, পুরোনো বাণিজ্যিক কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, পাশাপাশি শিল্পঘেঁষা শ্রমজীবী জনপদ—সব মিলিয়ে এই আসনের ভোটারদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা একরকম নয়। ফলে নির্বাচনী সমীকরণও এখানে বেশ জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–১০ আসনে মোট ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী শেখ রবিউল আলম রবি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে রয়েছেন এডভোকেট মো. জসীম উদ্দিন সরকার। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে হাতপাখা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মো. আ. আউয়াল মজুমদার। আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) থেকে ঈগল প্রতীকে প্রার্থী নাসরীন সুলতানা।
এ ছাড়া বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি) থেকে হাতি প্রতীকে মো. আবু হানিফ হৃদয়, জাতীয় পার্টি থেকে লাঙ্গল প্রতীকে বহ্নি বেপারী, বাংলাদেশ লেবার পার্টি থেকে আনারস প্রতীকে আবুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট) থেকে ছড়ি প্রতীকে মো. আনিছুর রহমান, আমজনতার দল থেকে প্রজাপতি প্রতীকে আব্দুল্লাহ আল হুসাইন এবং জনতার দল থেকে কলম প্রতীকে মো. জাকির হোসেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
প্রার্থী সংখ্যা বেশি হলেও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। তবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)কেও হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের একটি অংশকে টানতে এসব দল সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছে।
ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা তাহমিনা চৌধুরী বলেন, “আমি আশা করি আগামী দিনে ধানমন্ডিতে নিরাপত্তা, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিক সেবার মান আরও উন্নত হবে। আমরা এমন একজন প্রার্থী চাই, যিনি জনগণের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন এবং এলাকার জন্য বাস্তব পরিবর্তন আনবেন।”
নিউমার্কেট এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ কামরুল হাসান বলেন, “আমরা চাই নিউমার্কেটে আগামী দিনে যানজট কমবে, রাস্তা-মেরামত ও পানি নিষ্কাশনের সমস্যা সমাধান হবে। ভোট দেব এমন প্রার্থীকে, যিনি মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করবেন এবং এলাকার জীবনযাত্রা উন্নত করবেন।”
কলাবাগান থানা এলাকার বাসিন্দা মোঃ আলী হোসেন বলেন, “আমি আশা করি কলাবাগানে রাস্তাঘাট উন্নত হবে, গ্যাস সরবরাহ সঠিক হবে এবং পরিবেশ পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন থাকবে। আমরা এমন একজন যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেব, যিনি এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান আনবেন।”
হাজারীবাগ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী ফারসিদুল রহমান সাদ বলেন, “হাজারীবাগে নাগরিক সুবিধা আরও উন্নত হওয়া প্রয়োজন। আমরা চাই একজন দায়িত্বশীল ও সক্ষম প্রার্থী, যিনি এলাকায় বাস্তব পরিবর্তন আনবেন এবং মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করবেন।”
বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী শেখ রবিউল আলম রবি বলেন, সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো—জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে শুরু করেছে। গত ৩৩ বছর ধরে এই এলাকায় রাজনীতি করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এলাকার মানুষ নিজেরাই দায়িত্ব নিয়ে তাকে বিজয়ী করতে কাজ করছে। তার মতে, জনপ্রতিনিধির কাজ শুধু মানুষের বাড়ি বাড়ি যাওয়া নয়; বরং সংসদে ও সরকারের ভেতরে জনগণের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়া, এলাকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া এবং দরকষাকষির মাধ্যমে জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায় করা। ঢাকা–১০ আসনে বড় কোনো কাঠামোগত সমস্যা না থাকলেও সরকারি সেবা সংস্থাগুলোর চরম ব্যর্থতাকেই তিনি সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখছেন। নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও মানুষ সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, ডেসকো, ডিপিডিসি ও তিতাসের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জোরালো করা, ট্রাফিক ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানো এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করতে জাতীয় নির্বাচনের পর কঠোর উচ্ছেদ অভিযানের কথাও জানান তিনি। গ্যাস সংকট নিরসনে তিতাসের সঙ্গে আলোচনা, নীতিগত সিদ্ধান্ত, অর্থ বরাদ্দ এবং পাইপলাইন মেরামত ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে পাইপলাইনে সংযুক্ত এলাকাগুলোতে যেন মানুষ নির্বিঘ্নে গ্যাস ব্যবহার করতে পারে, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের নির্বাচন নয়—এটি রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার নির্বাচন; রাষ্ট্র জনগণের মালিকানায় থাকবে কি না, তা নির্ধারণ করবে এই ভোট।
১১ দলীয় জোট সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী এডভোকেট মো. জসীম উদ্দীন সরকার বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ঈমানের দাবি এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম দেশপ্রেমের কর্তব্য। তিনি বলেন, জুলাই যোদ্ধারা সেই দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময় পর্যন্ত সব শহীদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের রক্তের দায় শোধ করতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে। ঢাকা–১০ আসনের বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সংকট ও জলাবদ্ধতার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে এসব সমস্যা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করবেন। তার দাবি, অতীতের নেতারা দুর্নীতিবাজ নেতৃত্বের কারণে এসব সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করলে দেশ পাবে দুর্নীতিমুক্ত জনপ্রতিনিধি ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মো. আ. আউয়াল মজুমদার বলেন, নির্বাচনী প্রচারণা শুরু থেকেই ভোটারদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন। মানবতার পক্ষে কাজ করাই তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে কোরআন ও সুন্নাহভিত্তিক আইন বাস্তবায়নে কাজ করবেন। নিরাপত্তা নিয়ে তিনি কোনো শঙ্কা অনুভব করছেন না জানিয়ে বলেন, প্রশাসনের কাছ থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পাচ্ছেন এবং বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। নির্বাচিত হলে সংসদে দাঁড়িয়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, যানজট নিরসন, রাস্তা মেরামতসহ নাগরিক সব সুবিধা সহজ উপায়ে ও কম খরচে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করবেন বলেও জানান।
আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)–এর ঈগল প্রতীকের প্রার্থী নাসরীন সুলতানা বলেন, ঢাকা–১০ আসনে নিরাপত্তা ও নাগরিক সেবার ঘাটতি দূর করাই তার প্রধান অগ্রাধিকার। ছিনতাই ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় নতুন সিসিটিভি ও স্ট্রিট লাইট স্থাপন, নষ্ট ক্যামেরা ও ল্যাম্পপোস্ট দ্রুত মেরামতের মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদারের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। ইজারাকৃত মাঠগুলো ইজারামুক্ত না হওয়া পর্যন্ত সপ্তাহে অন্তত দুই দিন শিশু ও কিশোরদের জন্য উন্মুক্ত রাখার উদ্যোগের কথা বলেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি। সরকারি হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকের বরাদ্দ ও সেবা নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে কঠোর মনিটরিং সেল চালুর প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি নিরাপদ স্কুল জোন, স্মার্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিরসন, খোলা ম্যানহোলে ঢাকনা স্থাপন এবং ধানমন্ডি ৩১-এর বর্জ্য ট্রানজিট পয়েন্টের চাপ কমানোর কথাও তুলে ধরেন। হাজারীবাগকে আধুনিক টেক সিটি হিসেবে গড়ে তোলা, ধানমন্ডি লেক ঘিরে পরিকল্পিত সবুজায়ন, তরুণদের জন্য দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান এবং সকল নাগরিকের জন্য বিশুদ্ধ ও নিয়মিত পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও করেন তিনি।
সব মিলিয়ে ঢাকা–১০ আসনের ভোটারদের কাছে এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই নয়; এটি রাজনৈতিক অবস্থান, অতীতের হিসাব ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশার প্রতিফলন। প্রার্থীদের বক্তব্য, প্রতিশ্রুতি ও মাঠের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়—সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে ঢাকা–১০-এর ভোটাররা।




