ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeখোলা কলামনিস্তব্ধতার শব্দ, মানুষের কান্না এবং বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা

নিস্তব্ধতার শব্দ, মানুষের কান্না এবং বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা

মোঃ গোলাম মোস্তফা

উনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট জার্মান কবি ও চিন্তাবিদ Heinrich Heine একসময় ইউরোপের শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে একটি গভীর পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন

“In the silence one can hear a soft monotonous dripping.
It is the dividends of the capitalist continuously trickling in, continuously mounting up.
One can literally hear them multiply, the profits of the rich.
And one can hear too, in between, the low sobs of the destitute,
and now and then a harsher sound, like a knife being sharpened.”

বাংলা ভাবার্থ করলে দাঁড়ায়—
নিস্তব্ধতার মধ্যে শোনা যায় পুঁজিপতিদের লভ্যাংশের একটানা টুপটাপ শব্দ, যা ক্রমাগত বাড়ছে। আর সেই শব্দের ফাঁকে ফাঁকে শোনা যায় দরিদ্র মানুষের চাপা কান্না এবং মাঝে মাঝে এমন এক কর্কশ শব্দ, যেন ছুরিতে শাণ দেওয়া হচ্ছে।

১৮০ বছরেরও বেশি আগে লেখা এই সতর্কবার্তা আজকের বাংলাদেশেও বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর দেশের মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রত্যাশার জন্ম হয়েছিল। মানুষ আশা করেছিল—দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর অন্তত অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরবে, বাজারে স্থিতি আসবে, এবং সাধারণ মানুষের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তির বাতাস বইবে।

কিন্তু বাস্তবতা এখনো অত্যন্ত কঠিন।

গত কয়েক মাসের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা, অর্থনৈতিক প্রতিবেদন এবং বাজার পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়—দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখনো সাধারণ মানুষের জীবনে বড় চাপ সৃষ্টি করছে। চাল, ডাল, তেল, চিনি, মাছ, মাংস, সবজি—প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।

আজ বাজারে গেলে একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি যে সংকটে পড়েন, তা হলো—একটি সীমিত আয়ের মধ্যে কীভাবে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করবেন।

একজন দিনমজুর, একজন রিকশাচালক, একজন নিম্ন আয়ের চাকরিজীবী—তারা আজ প্রতিদিন নতুন করে হিসাব কষছেন।

কি কিনবেন? কি বাদ দেবেন? কোন সন্তানের পড়াশোনার খরচ কমাবেন? নাকি চিকিৎসা পিছিয়ে দেবেন?

এই নীরব সংগ্রামই হলো সেই “low sobs of the destitute”—যার কথা Heinrich Heine বলেছিলেন।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন— অর্থনৈতিক সংকট কখনো শুধু অর্থনীতির সংকট নয়। এটি রাজনৈতিক ও নৈতিক নেতৃত্বেরও পরীক্ষা।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বাজার নিয়ন্ত্রণ ও দ্রব্যমূল্য কমানোর বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষ এখনো কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি অনুভব করতে পারছে না। কারণ বাজারের মূল সমস্যা কেবল আন্তর্জাতিক নয়; এর সঙ্গে জড়িত আছে বাজার ব্যবস্থাপনা, সিন্ডিকেট, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অসঙ্গতি।

বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়নের বিরুদ্ধে নয়। মানুষ চায় উন্নয়ন। কিন্তু সেই উন্নয়ন হতে হবে মানুষের জন্য। যদি উন্নয়নের সুফল কেবল একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়, আর সাধারণ মানুষ অভাব, অনটন ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকে—তাহলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

আজ দেশের মানুষ শুধু অর্থনৈতিক স্বস্তি চায় না— তারা ন্যায়বিচারও চায়। তারা চায় একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। তারা চায় এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, অংশগ্রহণ থাকবে, এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতি মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে।

কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— যেখানে বৈষম্য বাড়তে থাকে, যেখানে মানুষের কষ্ট উপেক্ষিত হয়, যেখানে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সংকুচিত হয়— সেখানে সমাজের ভেতরে জমতে থাকে অস্থিরতা।

Heinrich Heine-এর “ছুরিতে শাণ দেওয়ার শব্দ” আসলে সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতীক। এটি কোনো সহিংসতার আহ্বান নয়; বরং একটি ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা—যে সমাজে বৈষম্য অসহনীয় হয়ে ওঠে, সেখানে স্থিতিশীলতা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন— সংলাপ, সহনশীলতা, ন্যায়বিচার এবং কার্যকর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ।

মানুষের দীর্ঘশ্বাসকে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অবকাঠামো নয়—তার মানুষ।

Heinrich Heine আমাদের সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেন— আমরা যেন শুধু “লভ্যাংশের শব্দ” না শুনি;
আমরা যেন মানুষের কান্নাও শুনতে পাই।

লেখক- প্রাবন্ধিক ও আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular