আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোকে আর লক্ষ্যবস্তু করা হবে না—যদি না সেসব দেশ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু করেছে এবং যার জবাবে তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিস্তৃত এলাকায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে, সেই যুদ্ধ এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে।
পেজেশকিয়ান আজ শনিবার জানান, শুক্রবার ইরানের অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।
ইরানি গণমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রতিবেশী দেশগুলোতে যে হামলা হয়েছে, সে জন্য দুঃখপ্রকাশও করেছেন।
আল জাজিরা জানায়, ইরানি প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য একটি উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে উত্তেজনা কমানোর ছোট হলেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানজুড়ে হামলা শুরু করার পর আজ অষ্টম দিন চলছে। ১৭০টির বেশি শহরে বিমান হামলা অব্যাহত থাকার খবর পাওয়া গেছে।
পেজেশকিয়ানের মন্তব্য ছিল আগেই রেকর্ড করা পাঁচ মিনিটের এক বক্তব্যে। আসাদি বলেন, “তিনি শুরুতেই আবাসিক এলাকা, স্কুল ও হাসপাতালের ওপর হামলার কথা উল্লেখ করেন, যা আন্তর্জাতিক আইন ও বিধিমালার লঙ্ঘন। এরপর তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জনগণের ঐক্য ও সংহতির আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিও কঠোর বার্তা দেন।”
নিজ বক্তব্যে পেজেশকিয়ান বলেন, “আমরা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করব—এটা এমন একটি স্বপ্ন, যা তাদের কবরে নিয়েই যেতে হবে। আমরা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক কাঠামোর প্রতিই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
এর আগে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রতি কঠোর আল্টিমেটাম দিয়ে “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” দাবি করেছিলেন।
তবে ইরানের শক্তিশালী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসও (আইআরজিসি) এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, “প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের পর সশস্ত্র বাহিনী আবারও ঘোষণা করছে যে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর স্বার্থ ও জাতীয় সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে এবং এ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসন চালায়নি।”
তবে তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, “যদি আগের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকে, তবে স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে পুরো অঞ্চলে অপরাধী আমেরিকা এবং ভুয়া জায়নবাদী শাসনের সব সামরিক ঘাঁটি ও স্বার্থকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর জোরালো ও বিধ্বংসী হামলার মুখে পড়তে হবে।”
এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আইআরজিসি
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, পেজেশকিয়ানের এই বার্তাকে ছাপিয়ে গেছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের প্রভাব। ইরানে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা রাষ্ট্র পরিচালনা এবং তুলনামূলকভাবে ‘অকৌশলগত’ বিষয়গুলো দেখভাল করেন। কিন্তু কৌশলগত বিষয় যেমন পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা নীতি—এসব ক্ষেত্রে রাজনীতিকদের কোনো মতামত থাকে না। সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্র পরিচালনায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি হলেও এসব বিষয়ে তারও কোনো ভূমিকা নেই—এটি ইরানে সুপরিচিত বাস্তবতা।
প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র হলো সর্বোচ্চ নেতার দপ্তর এবং আইআরজিসি, সেটা শান্তিকালেও।
এখন যখন দেশটি নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, তখন পেজেশকিয়ান কোনো হামলা বন্ধ করার অবস্থানে নেই। ফলে আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতি তার বার্তার তেমন গুরুত্বও নেই। এখনও সবকিছু পুরোপুরি আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণে আছে । হামলা করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত তারাই নেবে।
আইআরজিসির প্রধান আহমাদ বাহিদি সংগঠনটির প্রতিষ্ঠার পর থেকে অন্যতম ‘সবচেয়ে কট্টরপন্থী কমান্ডার’ হিসেবে বিবেচিত।
তিনি বলেন, “নিরাপত্তা নীতির ক্ষেত্রে পেজেশকিয়ান বা অন্য কোনো রাজনীতিকের প্রভাব থাকবে বলে আমি মনে করি না।”
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ তাদের সীমান্তের ভেতরে ও আশপাশে থাকার কারণে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান—এই ছয়টি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশ হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। পাশাপাশি ইরাক, জর্ডান, আজারবাইজান এবং তুরস্কও এ সংঘাতের ক্রসফায়ারে পড়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে এ হামলায় প্রাণহানি, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, ফ্লাইট চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন, আকাশসীমা বন্ধ এবং তেল ও গ্যাস উৎপাদনে বড় ধাক্কা লেগেছে—যার প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
এদিকে কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও বাড়লে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস পত্রিকায় গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে আল-কাবি বলেন, যুদ্ধ যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে, তবে “বিশ্বজুড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
তিনি বলেন, “সব জায়গায় জ্বালানির দাম বাড়বে। কিছু পণ্যের ঘাটতি দেখা দেবে এবং এমন এক শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে যেখানে অনেক কারখানাই উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ পাবে না।”
এ পর্যন্ত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যে ছয়জন নিহত হয়েছে, তারা কুয়েতে একটি মার্কিন কমান্ড সেন্টারে ইরানের হামলায় প্রাণ হারায়।
অন্যদিকে যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন। সূত্র: আল জাজিরা
ইরানের প্রযুক্তি চুরি করে তৈরি করা ড্রোনই ব্যবহৃত হচ্ছে ইরানের বিরুদ্ধে
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এমন কিছু অস্ত্র পরীক্ষা ও ব্যবহার করছে যা আগে খুব একটা পরিচিত ছিল না। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের ‘মহাকাশচারী’ ক্ষেপণাস্ত্র, তেমনি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এমন এক ড্রোন যা মূলত ইরানের প্রযুক্তি চুরি করেই তৈরি করা এবং এখন ইরানের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

ব্লু স্প্যারো:
এটি ইসরায়েলের তৈরি একটি ‘এয়ার-লঞ্চড ব্যালিস্টিক মিসাইল’। একে ‘মহাকাশ থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র’ বলা হয়, কারণ এটি উৎক্ষেপণের পর বায়ুমণ্ডলের একদম শেষ সীমানায় (মহাকাশের কাছাকাছি) চলে যায় এবং সেখান থেকে সরাসরি উলম্বভাবে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে লক্ষ্যবস্তুর ওপর আছড়ে পড়ে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে লক্ষ্য করে চালানো অভিযানে এই মিসাইলটি ব্যবহার করা হয়েছে। এর অদ্ভুত গতিপথের কারণে সাধারণ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা একে শনাক্ত বা ধ্বংস করতে পারে না।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। ইসরায়েলের ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’ বা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে প্রাণ হারিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। আর এই অভিযানে যমদূত হয়ে আকাশ থেকে নেমে এসেছিল ইসরায়েলের তৈরি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ব্লু স্প্যারো’ (Blue Sparrow)। মহাকাশের প্রান্ত ছুঁয়ে খাড়াভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার অসামান্য ক্ষমতার কারণে একে বলা হচ্ছে ‘মহাকাশ থেকে আসা মিসাইল’।
ব্লু স্প্যারো হলো একটি এয়ার-লঞ্চড ব্যালিস্টিক মিসাইল (ALBM)। সাধারণ ব্যালিস্টিক মিসাইল মাটি থেকে ছোড়া হলেও এটি যুদ্ধবিমান (যেমন: F-15 Eagle) থেকে নিক্ষেপ করা হয়। এটি তৈরি করেছে ইসরায়েলের খ্যাতনামা প্রতিরক্ষা সংস্থা রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস (Rafael Advanced Defense Systems)। মূলত ইসরায়েলের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘অ্যারো’ (Arrow) পরীক্ষার জন্য এটি তৈরি করা হলেও পরে একে বিধ্বংসী মারণাস্ত্রে রূপান্তরিত করা হয়।
এই মিসাইলটি পৃথিবীর অন্য যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্র থেকে আলাদা হওয়ার পেছনে কয়েকটি বিশেষ কারণ রয়েছে:
মহাকাশ ভ্রমণ ও রি-এন্ট্রি: নিক্ষেপের পর এটি বায়ুমণ্ডলের একেবারে শেষ প্রান্তে (Edge of space) চলে যায়। সেখান থেকে এর ‘রি-এন্ট্রি ভেহিকল’ বা সামনের অংশটি আলাদা হয়ে প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে খাড়াভাবে মাটির দিকে নেমে আসে।
দুর্ভেদ্য গতি: মহাকাশ থেকে নিচে নামার সময় এটি শব্দের গতির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি গতি (Hypersonic speed) প্রাপ্ত হয়।
শনাক্ত করা অসম্ভব: অধিকাংশ রাডার দিগন্তের দিক থেকে আসা মিসাইল ধরতে পারে। কিন্তু ব্লু স্প্যারো ঠিক মাথার ওপর থেকে সরাসরি নিচে পড়ে বলে শত্রু দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একে শনাক্ত বা ধ্বংস করার সময় পায় না।
নির্ভুল লক্ষ্যভেদ: এতে জিপিএস (GPS) এবং আইএনএস (INS) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে ছোড়া হলেও এটি লক্ষ্যবস্তুর মাত্র ৩ মিটারের মধ্যে আঘাত হানতে সক্ষম।
আঘাতের ক্ষমতা: এই মিসাইলটি প্রায় ৫০০ কেজি পর্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরক বহন করতে পারে। এটি কেবল ওপরের ভবনই নয়, বরং মাটির গভীরে থাকা বাঙ্কার ধ্বংস করতেও সক্ষম।
পাল্লা: এটি প্রায় ১,২৪০ মাইল (২,০০০ কিমি) পথ পাড়ি দিতে পারে। খামেনি হত্যার সময় তেহরানের পাস্তুর স্ট্রিটের বাসভবনে এর আঘাতে কয়েক ফুট গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে বলে স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে।
একটি ব্লু স্প্যারো মিসাইলের সঠিক দাম প্রতিরক্ষা গোপনীয়তার কারণে প্রকাশ করা না হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি মিসাইলের উৎপাদন ও পরিচালনা খরচ কয়েক মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে এই প্রযুক্তি এবং মিসাইলটি কেবলমাত্র ইসরায়েলের কাছেই রয়েছে। তবে এই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘ROCKS’ মিসাইল নিয়ে বিশ্বের অনেক শক্তিশালী দেশই এখন আগ্রহী।
লুকাস ড্রোন:
এটি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক’ বা আত্মঘাতী ড্রোন, যার নকশা হুবহু ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের মতো। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ড্রোনগুলোকে ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে এই লুকাস ড্রোন তৈরি করেছে। এটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী (প্রতিটি ৩৫ হাজার ডলার), যা একটি টমাহক মিসাইলের তুলনায় অনেক সস্তা।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর এই ড্রোন দিয়ে হামলা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা একে ‘যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্রতিশোধ’ বলে অভিহিত করছেন। এটি ঝাঁকবদ্ধভাবে হামলা করে শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকেজো করে দেয়।
পিআরএসএম:
এটি যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রজন্মের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। ২০২৬ সালের মার্চে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চলাকালীন এটি প্রথমবার যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এটি হাইমার্স লঞ্চার (হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম) থেকে নিক্ষেপ করা যায়। এটি পুরনো অ্যাটাকমস মিসাইলের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং ৫০০ কিলোমিটারের বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। নৌ ও আকাশপথে চলমান এই যুদ্ধে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র তাদের নতুন নতুন সব কৌশল ও সমরাস্ত্র শক্তি প্রদর্শন করেই চলেছে। এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানে প্রথমবারের মতো প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (পিআরএসএম) ব্যবহার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) গত বুধবার এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
শনিবার (৭ মার্চ) এই যুদ্ধ অষ্টম দিনে পদার্পণ করেছে। সংবাদামধ্যম আলজাজিরা এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ সেন্টকম তাদের এক পোস্টে উল্লেখ করেছে, পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী গভীর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা’ প্রদান করে।
সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারকে উদ্ধৃত করে ওই পোস্টে বলা হয়েছে, আমাদের ইউনিফর্মধারী পুরুষ ও নারীদের জন্য আমি অত্যন্ত গর্বিত। তারা আমাদের শত্রুদের জন্য সংকট তৈরি করতে উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছেন।
যদিও এই পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কোথা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে বা ইরানের কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তাহলে পিআরএসএম কী এবং প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের এটি ব্যবহারের গুরুত্ব কোথায়?
প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল বা পিআরএসএম হলো দূরপাল্লার নিখুঁত লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র। এর নির্মাতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘লকহিড মার্টিন’। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তারা মার্কিন সেনাবাহিনীর কাছে এই ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম চালান হস্তান্তর করে।
লকহিড মার্টিনের তথ্যমতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ৬০ কিমি (৩৭ মাইল) থেকে শুরু করে ৪৯৯ কিমিরও (৩১০ মাইল) বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এম-২৭০ এমএলআরএস এবং হিমার্স লাঞ্চার থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়। এই দুটি লাঞ্চারই লকহিড মার্টিনের তৈরি এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনী এগুলো ব্যবহার করছে।
এম-১৪২ হিমার্স হলো একটি উচ্চপ্রযুক্তি সম্পন্ন এবং ওজনে হালকা রকেট লাঞ্চার, যা চাকার ওপর বসানো থাকে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে এটি খুব দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলাচল করতে পারে। এক ইউনিটে ছয়টি জিপিএসচালিত রকেট অথবা বড় আকারের ক্ষেপণাস্ত্র (যেমন এটিএসিএমএস বা পিআরএসএম) বহন করা যায়। খুব অল্পসংখ্যক ক্রু দিয়ে মাত্র এক মিনিটের মধ্যে এটি পুনরায় লোড করা সম্ভব, এটি এই প্রযুক্তির অন্যতম বিশেষত্ব।
লকহিড মার্টিন জানায়, পিআরএসএম-এ ‘ওপেন সিস্টেম আর্কিটেকচার’ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে এর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সহজে আপগ্রেড করা বা অন্য কোম্পানির সরঞ্জামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়। এ ছাড়া এতে রয়েছে ‘আইএম এনার্জেটিক পেলোড’ বা সংবেদনহীন বিস্ফোরক প্রযুক্তি। এর অর্থ হলো, এই ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেডটি আগুন, কামানের গোলার আঘাত বা দুর্ঘটনার ফলে হুট করে বিস্ফোরিত হবে না, তবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সময় এটি ঠিকই শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটাবে। এই প্রযুক্তিই মূলত এই ক্ষেপণাস্ত্রকে বিশোয়িত করেছে।

পিআরএসএম মূলত বর্তমানে ব্যবহৃত এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্রের স্থলাভিষিক্ত হবে। এটি হিমার্স লাঞ্চারের বহনকারী যান পরিবর্তন না করেই এর পাল্লা ৩০০ কিমি থেকে বাড়িয়ে ৪৯৯ কিমিরও বেশিতে নিয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া পিআরএসএম’র ক্ষেপণাস্ত্র ধারণক্ষমতা এটিএসিএমএস’র দ্বিগুণ। একটি হিমার্স লাঞ্চারে যেখানে মাত্র একটি এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্র রাখা যায়, সেখানে এটি দুটি পিআরএসএম বহন করতে সক্ষম।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণে পিআরএসএম ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সেন্টকম। তারা একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে একটি উন্মুক্ত মরুভূমি থেকে এম-১৪২ হিমার্স সিস্টেমের মাধ্যমে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছোড়া হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান দূরপাল্লার সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে পিআরএসএম। কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান (বিশেষ করে মুসান্দাম উপদ্বীপ)—যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও সম্পদ রয়েছে—এই দেশগুলোর অন্তত কিছু অংশ ইরান থেকে ৪০০ কিমি-রও কম দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে পিআরএসএম’র পাশাপাশি অন্যান্য দূরপাল্লার অস্ত্র যেমন— লুকা ওয়ান-ওয়ে ড্রোন, এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন, এটিএসিএমএস এবং টমাহক ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করছে। লুকা ড্রোনের পাল্লা প্রায় ৮০০ কিমি, এটিএসিএমএস-এর ৩০০ কিমি এবং টমাহক ক্রুজ মিসাইলের পাল্লা প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিমি।
ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা বা রেঞ্জ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত ‘ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস’ (আইএনএফ) চুক্তির অধীনে এটি সম্ভবত নিষিদ্ধ থাকতো। ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেয়। কারণ হলো, এই ক্ষেপণাস্ত্রটি নির্দিষ্ট কিছু ভূমি-উৎক্ষেপিত ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য নির্ধারিত ৫০০ কিমি (৩১০ মাইল) সীমা অতিক্রম করতে সক্ষম।
চুক্তিটি ১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতা রোনাল্ড রিগান এবং সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ স্বাক্ষর করেছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল ইউরোপ থেকে ৫০০ কিমি থেকে ৫ হাজার ৫০০ কিমি পাল্লার ভূমিভিত্তিক পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং মাঝারি পাল্লার অস্ত্রভান্ডার নির্মূল করা।
চুক্তিটি স্থগিত হওয়ার পর ওয়াশিংটন তাদের নিজস্ব মাঝারি পাল্লার ভূমিভিত্তিক অস্ত্রাগার পুনরায় তৈরির সুযোগ পায়। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের পর রাশিয়া পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছিল যেন উভয় পক্ষই ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন না করার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। ওয়াশিংটন প্রথমে এটি প্রত্যাখ্যান করলেও ২০২২ সালে এ নিয়ে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল।
তবে গত বছরের আগস্টে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই স্থগিতাদেশ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। মস্কো জানায়, যুক্তরাষ্ট্র এই প্রযুক্তি উন্নয়নে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ করেছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে এসব ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা ‘প্রকাশ্যে ঘোষণা’ করেছে। পশ্চিমা দেশগুলোর এই ধরনের পদক্ষেপ মস্কোর নিরাপত্তার জন্য একটি ‘সরাসরি হুমকি’ বলে উল্লেখ করা হয় রুশ বিবৃতিতে।
এর একটি প্রধান সুবিধা হলো, এটি আকারে ছোট হওয়ায় একই লঞ্চারে আগের চেয়ে দ্বিগুণ মিসাইল বহন করা যায়। -এনডিটিভি




