নিউজ ডেস্ক: শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা ছয়টি মূল কারণকে দায়ী করছেন। তারা বলছেন, সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, সময়মতো রোগ শনাক্ত না হওয়া, স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট, অর্থায়ন সংকটে সেক্টর কর্মসূচি স্থগিত, ভিটামিন ‘এ’ ও কৃমিনাশক বিতরণ না হওয়া এবং প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থাকা।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এসব কারণ মিলিত হওয়ায় সংক্রমণ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তারা দ্রুত গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং আক্রান্ত শিশুদের পৃথক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হাম শনাক্ত হয়েছে ৬৭৬ শিশুর শরীরে। গত বছর এই সময়ে হাম আক্রান্ত রোগী ছিল ৯ জন। এর আগে ২০২৪ সালের এই সময়ে আক্রান্ত রোগী ছিল ৬৪ জন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথম তিন মাসে রোগী বেড়েছে ৭৫ গুণ। আর ২০২৪ সালের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ১১ গুণ। দেশের আট বিভাগে শনাক্ত হামের রোগীর এমন তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে রোগটিতে কত শিশু মারা গেছে, তার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এর আগে ২০২৫ সালে সারাদেশে হাম আক্রান্ত হয়েছিল ১২৫ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি ২৪৫ জন হাম আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে; যা মোট রোগীর ৩৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। এরপর রাজশাহী বিভাগে ১৩৭ জন বা ২০ দশমিক ২৬ শতাংশ। চট্টগ্রামে ৯৩ জন বা ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ময়মনসিংহে ৮০ জন বা ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। বরিশাল ও খুলনায় ৫১ জন বা ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ করে। সিলেটে ১৩ জন বা ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। রংপুর বিভাগে ছয়জন বা ০.৮৮ শতাংশ হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শুধু সরকারি হাসপাতালের তথ্য দিয়েছে। এর বাইরে অনেকেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে যা তথ্য নেই অধিদপ্তরের কাছে।
এদিকে বিভিন্ন হাসপাতালের বরাত দিয়ে পাঠানো সমকাল প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ৪১ জন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এদের হামের উপসর্গসহ অন্যান্য জটিলতা ছিল বলে জানা গেছে। এর মধ্যে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ১৫ জন, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ছয়, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে চার এবং রাজশাহী, পাবনা ও গোপালগঞ্জে একজন করে শিশু মারা গেছে। এ ছাড়া বরিশালে এক, বরগুনায় তিন, ভোলায় দুই এবং ঝালকাঠিতে দুজন হামের উপসর্গ নিয়ে আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
দেশের হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় গতকাল জাতীয় টিকাদান কারিগরি পরামর্শক দল (নাইটেগ) হামের টিকা দেওয়ার বয়স ছয় মাসে নামানোর সুপারিশ করেছে। কারণ সাম্প্রতিক সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুদের এক-তৃতীয়াংশ ৯ মাসের কম বয়সী, যা বর্তমান টিকাদানের বয়সসীমার বাইরে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন গতকাল সচিবালয়ে বলেন, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য হামের টিকা দেওয়া হবে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে, যা সম্ভবত জুন বা জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত হবে। এই কর্মসূচিতে দুই কোটি শিশুর টিকা দেওয়া হবে। এই বিশেষ কর্মসূচিতে ছয় মাসের শিশুরাও টিকা পাবে। তবে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ ও ১৫ মাস বয়সের শিশুদের দুই ডোজ টিকা দেওয়ার নিয়ম আগের মতোই থাকবে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ সমকালকে বলেন, বিশেষ কর্মসূচি সাধারণত প্রতি ছয় বছর পরপর নেওয়া হয়; সর্বশেষ ২০২০ সালে ডিসেম্বর করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের পরিকল্পিত বিশেষ কর্মসূচি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কার্যকর করা যায়নি। গত বছর গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্য সহকারীদের ধর্মঘটের কারণে নিয়মিত টিকাদান অন্তত তিনবার ব্যাহত হয়েছে। অর্থায়ন সংকটে সেক্টর কর্মসূচি স্থগিত থাকায় টিকাদান কার্যক্রমে বিভ্রাট সৃষ্টি হয়েছে। নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ ও কৃমিনাশক বিতরণও হয়নি, যা শিশুদের পুষ্টির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত; অপুষ্ট শিশুরা হামে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সিয়াম মোয়াজ্জেম বলেন, যেসব শিশু এখনও টিকা নেয়নি, বিশেষ করে ১৫ মাসের কম বয়সী শিশু বা যারা এক বা দুই ডোজ টিকা থেকে বঞ্চিত, তাদের মধ্যে হামের সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া অপুষ্টি বা কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা শিশুরা আরও ঝুঁকিতে থাকে। বুকের দুধ পান করলে শিশুর শরীরে মায়ের কাছ থেকে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক। তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা সমানভাবে কার্যকর হয় না। তিনি আরও বলেন, যেসব শিশু ‘এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং’ পায়নি বা পুষ্টিহীন, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকে। ফলে এসব শিশুর হামে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক হালিমুর রশীদ বলেন, প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থাকে, ফলে কয়েক বছর পরপর হামের প্রাদুর্ভাব চক্রাকারে ফিরে আসে। টিকাদান কর্মসূচি ও শিশুদের পৃথক চিকিৎসা নিশ্চিত করা না হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমী বলেন, হাম নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই। কারণ উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের মধ্যে ২০ শতাংশের নমুনায় হামের জীবাণু মিলছে। এসব রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিতে সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।




