মো. জহিরুল ইসলাম : একজন মানুষ দোকান বন্ধ করে ঘরে ফিরছিলেন। আর মাত্র এক মিনিটের পথ বাকি ছিল। সেই পথেই নেমে এলো এমন সহিংসতা, যার ব্যাখ্যা আজও খুঁজে পাচ্ছে না পরিবার। শরীরে একের পর এক কোপ, পেটের নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে যাওয়া ক্ষত, তারপর পেট্রল ঢেলে আগুন—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি হামলা নয়, বরং এক নির্মম হত্যাচেষ্টা। জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটির নাম খোকন চন্দ্র দাস।
শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলাধীন কনেশ্বর ইউনিয়নের তিলই এলাকায় বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। কেউরভাঙ্গা বাজারসংলগ্ন এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন খোকন চন্দ্র দাস (৪৮)। তিনি তিলোই এলাকার পরেশ চন্দ্র দাসের ছেলে এবং স্থানীয় বাজারে একটি ফার্মেসি ও মোবাইল ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা করতেন।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও দোকান বন্ধ করে বাড়ির পথে রওনা দিয়েছিলেন খোকন দাস। পরিবার বলছে, বাড়িতে পৌঁছাতে তখন আর এক মিনিটও লাগত না। ঠিক সেই মুহূর্তেই মসজিদের পাশের সরু রাস্তায় তাকে ঘিরে ধরে দুর্বৃত্তরা।
খোকন দাসের বোন অঞ্জনা রানী দাস বলেন, ‘প্রথমে একটা কোপ দেয়। সঙ্গে সঙ্গে আমার ভাই মাটিতে পড়ে যায়। পড়ে যাওয়ার পর আরও তিনটা কোপ দেয়। পেটের ভুঁড়ি বের হয়ে যায়।’
কিন্তু এখানেই থামেনি সহিংসতা। তিনি বলেন, ‘ওই শোয়া অবস্থায় শরীরে পেট্রল ঢেলে দেয়। তারপর আগুন ধরিয়ে দেয়।’
আগুনে জ্বলতে থাকা শরীর নিয়ে কী করবে—তা বুঝে ওঠার আগেই চারপাশ থেকে চিৎকার ভেসে আসে, পানিতে ঝাঁপ দিতে। খোকন দাস তখন পাশের পুকুরে ঝাঁপ দেন। পুড়ে যাওয়া শরীর নিয়েই সাঁতরে ওঠেন পুকুরের অন্য পারে।
কাঁপা গলায় বলেন, ‘আমাকে বাঁচাও।’ সামনে আসে তার ছেলে। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘বাবা আমাকে বাঁচাও।’ এই কথাগুলো হাসপাতালে শুয়ে নিজের বোনকে বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঢামেকে কোপানো ক্ষতগুলোর চিকিৎসা দেওয়ার পর শরীরে আগুনে দগ্ধ হওয়ার চিকিৎসার জন্য বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে তাকে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে হস্তান্তর করা হয়।
জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, ‘তার শরীরের প্রায় ৩০ শতাংশ পুড়ে গেছে। ফেস বার্ন হয়েছে, শ্বাসনালীতেও পোড়ার লক্ষণ রয়েছে। অবস্থা আশঙ্কাজনক। বর্তমানে তিনি চারতলার আইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে খোকন দাসের স্ত্রী সীমা দাস বলেন, ‘আমার স্বামী খুব শান্ত মানুষ। কারও সঙ্গে কোনো শত্রুতা ছিল না। দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার এক মিনিট আগেই তাকে এভাবে কুপিয়ে, পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হলো—আমি বুঝতে পারছি না কেন?’
তিনি বলেন, ‘প্রথমে মাথায় কোপ, তারপর পেটে তিনটা কোপ। শেষে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। উপায় না পেয়ে সে পুকুরে ঝাঁপ দেয়।’
সীমা দাস জানান, হামলাকারীরা তাদের এলাকারই—‘একজন রাব্বি, একজন সোহাগ। আরেকজন ছিল, নাম মনে নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে তার কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এরপর হত্যার উদ্দেশ্যে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয় এবং পরে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।’
খোকন দাসের ভাগ্নির জামাই প্রান্ত দাস বলেন, ‘যদি টাকা নিত, তাহলে নিয়ে যেত। এভাবে কুপিয়ে, পেট্রল ঢেলে আগুন ধরাত না। তাহলে কেন এই ছোট ছেলেগুলো এমন করল—এই প্রশ্নটাই আমাদের পোড়াচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, গতকাল, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে দুইজন ভারতীয় গণমাধ্যম কর্মী আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। তারা দাবি করেছিল, তারা বাংলাদেশ প্রতিনিধি। তবে আমি তাদেরকে কোনওভাবেই এমন কোনও বক্তব্য দেইনি, যা খোকন দাসের মৃত্যুর কারণ বা ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
সম্প্রতি শুক্রবার (০২ জানুয়ারি) দুপুরে ভারতের গণমাধ্যম নিউজ ১৮ বাংলা-এ অনলাইন পোর্টালে খোকন দাসের স্ত্রী সীমা দাসের বক্তব্য হিসেবে এমন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, ‘আমাদের কারও সঙ্গে কোনও শত্রুতা ছিল না। কেন আমার স্বামীকে এত নৃশংসভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হল, আমি এখনও বুঝে উঠতে পারছি না।’ তার অভিযোগ, ‘ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেই এই হামলা হয়ে থাকতে পারে।’
প্রান্ত দাস বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করতে চাই, এই বক্তব্য ভিত্তিহীন। এটি সীমা দাসের বক্তব্য বলে প্রকাশ করা হয়েছে, কিন্তু অসত্যভাবে আমার মাধ্যমে বা অন্য কোনোভাবে দেওয়া হয়নি। এই ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে আমি প্রতিবাদ জানাই।’
ভাগিনা সৌরভ দাস জানান, ‘পুলিশ অভিযুক্ত রাব্বি ও সোহাগকে না পেয়ে তাদের বাবাকে আটক করে। তারা বলেছে, আইন অনুযায়ী তাদের ছেলেদের যে শাস্তি হয়, সেটাই দেওয়া হোক।’
খোকন দাস এখনো আইসিইউতে। পরিবার জানে না তিনি বাঁচবেন কি না। কিন্তু তারা জানে—এই সহিংসতা শুধু একজন মানুষকে আঘাত করেনি, ভেঙে দিয়েছে একটি পরিবারকে, আতঙ্কে ফেলেছে একটি এলাকাকে।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—একজন শান্ত স্বভাবের হিন্দু ব্যবসায়ীকে কেন এত নির্মমভাবে হত্যার চেষ্টা করা হলো? এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত পরিবার শুধু অপেক্ষা নয়, প্রতিদিন লড়ছে অসহায় যন্ত্রণার সঙ্গে।
এদিকে, শরীয়তপুরের ডামুড্যায় ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে কুপিয়ে ও শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় একটি মামলা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে তার বাবা পরেশ চন্দ্র দাস বাদী হয়ে তিনজনের নামে মামলাটি করেন। এখন পর্যন্ত তাদের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ভুক্তভোগী খোকন চন্দ্র দাস হামলায় অংশ নেওয়া দুজনের নাম জানিয়েছেন। এছাড়া পুলিশের তদন্তে আরও একজনের নাম উঠে এসেছে। ওই তিনজনকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন ডামুড্যার কনেশ্বর এলাকার সোহাগ খান (২৭), রাব্বি মোল্যা (২১) ও পলাশ সরদার (২৫)। ঘটনার পর থেকে তাঁরা আত্মগোপনে আছেন। পুলিশ দুজনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাদের বাবাদের আটক করে থানায় নিয়ে আসে, তবে পরে ছেড়ে দেয়।
এদিকে, শনিবার (৩ জানুয়ারি) সকাল ৭টা ২০ মিনিটের দিকে ঢাকার জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. শাওন বিন রহমান। তিনি যুগান্তরকে জানান, খোকন চন্দ্র দাস প্রায় তিন দিন ধরে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শনিবার সকাল ৭টা ২০ মিনিটের দিকে তিনি মারা যান। তার শরীরের প্রায় ৩০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। বিশেষ করে মুখমণ্ডল ও শ্বাসনালী সম্পূর্ণভাবে পুড়ে গিয়েছিল। মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
খোকন চন্দ্র দাসের ভাগ্নির জামাই প্রান্ত দাসও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, তিন দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শনিবার সকালে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় জড়িত অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে খোকন চন্দ্র দাস ছুরিকাঘাতের শিকার হন। এ সময় তিনি হামলাকারীদের চিনে ফেলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে দুর্বৃত্তরা তার শরীর ও মুখে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টা চালায়।
গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠান। এরপর তাকে জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।
তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত শনিবার সকালে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবি করেছেন নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা।




