লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে উন্নয়নকাজের বিল ছাড়াতে কমিশন নেওয়া, অসম্পূর্ণ ভবনের বিপরীতে শতভাগ বিল পরিশোধ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে গত ২০ দিনে তাঁকে তিন দফা বদলি করা হলেও শেষ পর্যন্ত আবারও লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় বহাল করা হয়েছে।
এলজিইডির দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, গত ৩১ আগস্ট প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক আদেশে (স্মারক নম্বর ৯৫৩৫) ইকবাল হোসেনকে ফেনীর পরশুরাম উপজেলায় বদলি করা হয়। এর এক সপ্তাহের মধ্যে তাঁকে পরশুরাম থেকে সরিয়ে লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার সহকারী প্রকৌশলী করা হয়। এরপর গত ২১ সেপ্টেম্বর আরেকটি আদেশে (স্মারক নম্বর ১০১৪৭) আগের বদলি আদেশ বাতিল করে তাঁকে আবার লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় বহাল করা হয়।
স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, প্রধান প্রকৌশলীকে ‘ম্যানেজ’ করে ইকবাল হোসেন বদলি বাতিল করিয়েছেন। তবে এই অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অসম্পূর্ণ ভবনে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা বিল
লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) পাঁচতলা একাডেমিক ভবন ও মহিলা হোস্টেল নির্মাণকাজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্প দুটির মোট চুক্তিমূল্য ৩৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৩৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, দুটি ভবনের আস্তর, রং, টাইলস, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও আসবাবপত্রের বেশ কিছু কাজ এখনো শেষ হয়নি। অথচ প্রকল্পের প্রায় পুরো অর্থই পরিশোধ করা হয়েছে।
কাজ শেষ হওয়ার আগেই শতভাগ বিল নেওয়ার বিষয়টি ঠিকাদার বেলাল হোসেন এবং এলজিইডির জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী স্বীকার করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
কমিশন নেওয়ার অভিযোগে তদন্ত
নির্মাণাধীন মসজিদ, পুকুর ঘাটলা, কালভার্ট ও গভীর নলকূপের বিল পাসের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ তদন্তে গত ১৫ জুলাই এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ এস এম মহসীনকে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ-সংক্রান্ত দপ্তরের স্মারক নম্বর ৭২৫৯।
তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই ইকবাল হোসেনকে একাধিকবার বদলি ও পুনরায় সদর উপজেলায় পদায়নের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় ঠিকাদারেরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঠিকাদার বলেন, ইকবাল হোসেন আবার সদর উপজেলায় ফিরে আসার পর তাঁর আচরণ আরও কঠোর হয়েছে। তাঁরা অভিযোগগুলোর দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এলজিইডির কয়েকজন কর্মচারীর অভিযোগ, ইকবাল হোসেন প্রায়ই তাঁদের সঙ্গে অশালীন ভাষায় কথা বলেন এবং গালিগালাজ করেন। এতে কার্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
জিয়াউল হককে সদর থেকে সরিয়ে চন্দ্রগঞ্জে
বরিশালের মুলাদী উপজেলা থেকে বদলি হয়ে আসা কর্মকর্তা মো. জিয়াউল হককে প্রথমে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় পদায়ন করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, দায়িত্ব নিতে গেলে ইকবাল হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে ২১ সেপ্টেম্বরের আরেকটি অফিস আদেশে (স্মারক নম্বর ১০১৪৬) জিয়াউল হকের সদর উপজেলার পদায়ন সংশোধন করে তাঁকে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলায় পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে জিয়াউল হকের বক্তব্য জানা যায়নি।
যা বলছেন ইকবাল হোসেন
মো. ইকবাল হোসেনকে তাঁর কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি। তাঁর ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন নম্বরও বন্ধ পাওয়া যায়।
এর আগে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইকবাল হোসেন বলেছিলেন, ‘যে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে, সে অপরাধী।’
এ বিষয়ে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর লক্ষ্মীপুর জেলা সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, কাজ অসম্পূর্ণ রেখে শতভাগ বিল পরিশোধ ও কমিশন নেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।



