ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসারাদেশকিশোরগঞ্জের চ্যাপা শুঁটকি, রপ্তানি হয় বিদেশেও

কিশোরগঞ্জের চ্যাপা শুঁটকি, রপ্তানি হয় বিদেশেও

 বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবার কাছেই একটি জনপ্রিয় খাবার চ্যাপা শুটকি। বিশেষ করে হাওর, নদী, খাল-বিল সমৃদ্ধ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর কাছে শুটকি যেন খাদ্য তালিকার এক অপরিহার্য অংশ। প্রধানত তিনভাবে শুটকি খাওয়া হয়। ভর্তা, বুনা আর সবজি দিয়ে তরকারি। এর বাইরে চ্যাপা দিয়ে কুমড়া পাতার বড়া আর চ্যাপার তৈরি পিঠাও একটি লোভনীয় খাবার।কিশোরগঞ্জের সকল জলাশয়ে নতুন পানি আসছে। ফলে এসব জলাশয়ে এখন মিঠা পানির প্রচুর মাছ ধরা পড়ছে। গ্রামীণ শুটকি ব্যবসায়ীরা স্থানীয় বাজার থেকে পুঁটি, টাকি, টেংরা, মেনি, পাবদা, চিকরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ কিনে নিয়ে আসেন। জাত অনুযায়ী ১০০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে এসব মাছ কেনা হয়। এরপর নারী শ্রমিক লাগিয়ে এসব মাছ কুটে উন্মুক্ত আকাশের নিচে বিশাল বিশাল মাচার ওপর মাছগুলো ছড়িয়ে দিয়ে দু’তিন দিন শুকিয়ে তৈরি করা হয় শুটকি। এসব মাচাকে স্থানীয়ভাবে ‘ডাঙ্গি’ নামেও ডাকা হয়।

সম্প্রতি ইটনা উপজেলার চৌগাঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, শুটকি ব্যবসায়ী হারেছ মিয়া ও নাঈম মিয়া বাজার থেকে শুটকির জন্য প্রচুর পুঁটিসহ বিভিন্ন জাতের মাছ কিনে এনেছেন। মাছগুলো বাড়ির উঠোনে বসে নারী শ্রমিকরা কুটছেন। নারী শ্রমিক মনোয়ারা বেগম, হাবিয়া খাতুন ও স্বপ্না বেগম জানালেন, তাঁরা শুটকির মাছ কুটার ওপর কুলিয়ারচর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন। সংসারের কাজের পাশাপাশি প্রায় ১৫ বছর ধরে তাঁরা এ পেশায় আছেন। মাছের তেল আর কিছু কাঁচা মাছের বিনিময়ে এসব মাছ কুটে দেন। ১০ থেকে ২০ জন নারী শ্রমিক গোল করে বসে মাছ কুটতে শুরু করেন। এসব মাছ তরকারির মাছের মত এতটা পরিস্কার করে কুটতে হয় না। যে কারণে ২০ জনে দৈনিক অন্তত ৬০ মণ মাছ কুটে ফেলতে পারেন বলে জানালেন তাঁরা। এরপর সেগুলো উন্মুক্ত আকাশের নীচে বিশাল বিশাল মাচার ডাঙ্গির ওপর ছড়িয়ে দেয়া হবে। গ্রামের পাশেই রয়েছে নরসুন্দা নদী। নদীর ওপর বাঁশের খুঁটি আর জাল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশাল বিশাল ডাঙ্গি। এসব ডাঙ্গির ওপর কিছু শ্রমিককে মাছ শুকাতে দেখা গেছে।

ডাঙ্গি মালিক হারেছ মিয়া জানালেন, তিনি পুঁটি মাছসহ অন্যান্য মাছ জাত ভেদে ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে কিনে আনেন। মাছগুলো কুটার পর ডাঙ্গির ওপর ছড়িয়ে দিয়ে দু’তিন দিন রোদে শুকিয়ে শুটকি করা হয়। এসব শুটকি আকার এবং প্রকারভেদে ৮ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা মণ দরে আড়তে বিক্রি করেন। তিনি এক মৌসুমে ২৫০ মণ থেকে ৩০০ মণ শুটকি বিক্রি করতে পারেন। অপর ডাঙ্গি মালিক নাঈম জানালেন, তিনি প্রতি মৌসুমে অন্তত এক হাজার মণ শুটকি বিক্রি করতে পারেন।

অনেক ভোজন রসিক শুটকির পদ দিয়েই পেট ভরে ভাত খেয়ে ফেলেন। এক সময় খাবার হোটেলে শুটকির কোন পদ বিক্রি হতো না। সময়ের পরিক্রমায় এটি এখন জনপ্রিয় পদ হয়ে উঠেছে। ফলে স্বল্প পুঁজির হোটেলসহ অভিজাত হোটেলেও এখন শুটকির বিভিন্ন পদ তৈরি হচ্ছে। উঁচু তলার মানুষেরাও এখন সখ করে শুটকির বিভিন্ন পদ খাচ্ছেন। কিশোরগঞ্জের উন্নত মানের শুটকি এখন বিদেশেও যাচ্ছে। শুটকি ব্যবসায়ীরা জানালেন, ইটনা উপজেলার চৌগাংগা এলাকায় শুটকির অন্তত ৫০টি ডাঙ্গি আছে। জেলার কুলিয়ারচর, নিকলী, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম এবং এরকম প্রচুর শুটকির ডাঙ্গি রয়েছে।

কিশোরগঞ্জ জেলা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মুজিবুর রহমান বেলাল বলেছেন, কিশোরগঞ্জে শুটকি ব্যবসা স্থানীয় মৎস্য অর্থনীতিতে একটি বিশাল অবদান রাখছে। এই জেলায় বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকার শুটকির বাণিজ্য হয়। কেবল আর্থিক লেনদেন নয়, এই খাতে বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা হয়।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম জানিয়েছেন, কিশোরগঞ্জে বছরে বিভিন্ন জাতের শুটকি উৎপন্ন হয় ৯৬৬ দশমিক ৮৫ মেট্রিক টন। শুটকির চাহিদা সারা বছরই থাকে। সংরক্ষণও করা যায় সারা বছর। যে কারণে শুটকি ব্যবসা একটি নিরাপদ ব্যবসা বলেও মনে করা হয়।

কিশোরগঞ্জের চ্যাপা শুঁটকি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

  • উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ: জেলার হাওর অঞ্চল (নিকলী, অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইন) ও হোসেনপুরের তাজা পুঁটি মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করা হয়。 এরপর পরিষ্কার করে মটকায় ঠেসে রেখে প্রায় ৫-৬ মাস জাগ দিয়ে চ্যাপা তৈরি করা হয়।
  • সবচেয়ে বড় বাজার: জেলা সদরের ‘বড় বাজার’ হলো চ্যাপা শুঁটকির প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানে সপ্তাহে দুদিন (বুধ ও বৃহস্পতিবার) হাট বসে এবং কয়েক কোটি টাকার শুঁটকি বেচাকেনা হয়
  • রপ্তানি ও জনপ্রিয়তা: প্রবাসীদের মাধ্যমে জনপ্রিয়তার কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ চ্যাপা শুঁটকি বিদেশে পার্সেল বা বাণিজ্যিক উপায়ে পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশী নাগরিকরাও এখন এর স্বাদ নিচ্ছেন।
  • চাহিদা ও দাম: স্থানীয়ভাবে এটি খুবই আদৃত এবং সুস্বাদু ভর্তা তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়。 মানের ওপর ভিত্তি করে প্রতি কেজি চ্যাপা শুঁটকি ৮০০ থেকে ১,২০০ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হয়ে থাকে।
RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular