মাহমুদ মীর
কোরবানির মূল উদ্দেশ্য পশুর রক্ত বা মাংস নয়, বরং আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাস ও নিখাদ ভালোবাসা এবং তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা। সুস্থ ও শরিয়তসম্মত পশুর মাধ্যমে হালাল উপার্জনে এই ইবাদত পালনের মাধ্যমে মনের পশুত্ব ও অহংকার বিসর্জন দেওয়া অপরিহার্য।
لَنْ يَنَالَ اللهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلٰكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوٰى مِنْكُمْ
‘আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না—পৌঁছায় কেবল তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)
তাই কুরবানির পর বর্জ্য পরিষ্কার না করা মানে কুরবানির তাকওয়াকেই অসম্পূর্ণ রাখা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন—রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা সদকা। (বুখারি, হাদিস: ২৯৮৯) তাহলে কুরবানির বর্জ্য পরিষ্কার করা—শুধু দায়িত্ব নয়, এটি সদকার সমতুল্য ইবাদত।
পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন—পশুর রক্ত ও বর্জ্য মাটিতে পুঁতে ফেললে তা মাটির উর্বরতা বাড়ায়। কিন্তু খোলা রাস্তায় ফেলে রাখলে তা পানি দূষণ করে, মাটির pH পরিবর্তন করে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাটির জীবাণু সক্রিয়তা নষ্ট করে।
একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়—বাংলাদেশে প্রতি বছর কুরবানি ঈদে প্রায় এক কোটির বেশি পশু কুরবানি হয়। প্রতিটি পশু থেকে গড়ে ১০-১৫ কেজি বর্জ্য তৈরি হয়। মোট বর্জ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০-১৫ লক্ষ টন। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না হয়—তাহলে পরিবেশ বিপর্যয় অনিবার্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ: রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বদা পরিচ্ছন্নতার প্রতি যত্নশীল ছিলেন। তিনি বলেছেন—
وَتُمِيطُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
‘রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও একটি সাদাকা।’ (মুসলিম, হাদিস: ১০০৯) তিনি আরও বলেছেন—’তোমরা তোমাদের আঙিনা পরিষ্কার রাখো।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৭৯৯)
কাজেই নবি (সা.) রাস্তা থেকে একটি পাথর সরানোকেও সদকা বলেছেন—সেই নবির উম্মত হয়ে মুমিন মুসলমান কুরবানির বর্জ্য রাস্তায় ফেলে রেখে নিশ্চয়ই সদকার আশা করতে পারেন না।
প্রতিবছর ঈদুল আযহার পর কয়েকদিন শিশু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। ঢাকার এক একটি আবাসিক এলাকায় ফার্মেসিগুলো —তীব্র ডায়রিয়া ও বমিতে আক্রান্ত শিশুর সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বিক্রি করে।
একজন শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন—পানি দূষণ থেকে এই সংক্রমণ। সেই পানি দূষিত হয় কুরবানির রক্ত ড্রেনে পড়ে।
কোরবানির পশু নাকি কোরবানি দাতা দায়ী এই শিশুদের অসুস্থতার জন্য সেটা ভাববার সময় এখনই। যিনি কুরবানি দেন তাকে ভাবতে হবে কোরবানির রক্ত ড্রেনে ফেললে কোথায় যায়। আল্লাহর দরবারে সেই কুরবানির হিসাব কী হবে—যে কুরবানির বর্জ্য একটি নিরীহ শিশুর কষ্টের কারণ হয়। এটা তর্কের বিষয় নয়, সচেতনতার বিষয়।
পাড়ায় পাড়ায় কোরবানির পশু জবাই করার জন্য একটি, দ্রুত গরুর চামড়া ছাড়ানোর জন্য দুইটি এবং গোশত, হাড়, নাড়িভুড়ি ইত্যাদির জন্য ৫টি স্থান আধুনিক কিংবা সনাতন যন্ত্রপাতিসহ কেন্দ্র গড়ে তুলে এ সমস্যা কমিয়ে আনার একটি পরামর্শ বাস্তবায়ন করুন।
কোরবানির আগেই একটু প্রস্তুতি নিন। জবাইয়ের আগে একটি গর্ত করুন—যাতে রক্ত সরাসরি মাটিতে শোষিত হয়। জনবহুল রাস্তায় বা ড্রেনের মুখে কুরবানি দেবেন না। জবাইয়ের পর নাড়িভুঁড়ি ও অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য মাটিচাপা দিন—পরিবেশ উপকৃত হবে, মাটির উর্বরতা বাড়বে। জবাইয়ের স্থান পানি দিয়ে ধুয়ে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দিন। সিটি কর্পোরেশনের ডাস্টবিনে নির্ধারিত ব্যাগে বর্জ্য রাখুন। এই কাজগুলো করতে মাত্র কিছু সময় লাগবে। কিন্তু এতে যা অর্জন হবে তা অমূল্য—প্রতিবেশীর দোয়া, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং একটি সুস্থ পরিবেশ।
কুরবানি ইবরাহিম (আ.)-এর সেই মহান ত্যাগের স্মরণ—যিনি আল্লাহর জন্য সবকিছু উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। সেই ত্যাগের চেতনা যদি সত্যিই আমাদের হৃদয়ে থাকে—তাহলে একটু কষ্ট করে বর্জ্য পরিষ্কার করার প্রস্তুতি নিন।
আসুন এবার প্রতিজ্ঞা করি—কোরবানির পর আমার এলাকা আমি নিজেই পরিষ্কার করব। শুধু সিটি কর্পোরেশনের অপেক্ষায় থাকব না। কারণ পরিষ্কার রাখা শুধু আমার দায়িত্ব নয়—এটি আমার ঈমানের অঙ্গ।
এই ঈদে সেরা কোরবানিদাতা হবেন তিনি যিনি সবচেয়ে বড় পশু কোরবানি দেয়ার জন্য নয়,—সেরা তিনি যিনি কোরবানির পর তার কোরবানির স্থান সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ পরিচ্ছন্ন করেছেন। যার প্রতিবেশীরা তাঁর পরিচ্ছন্নতার জন্যে বলেছে—’আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের পরিবেশ নষ্ট হয়নি, কোনো কষ্ট হয়নি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—’তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম, যে তার প্রতিবেশীর কাছে উত্তম।’ (বুখারি, হাদিস: ৬০১৫)




