ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeলিডজোবরা গ্রামে গ্রেপ্তার আতঙ্ক, সংঘর্ষে ক্ষয়ক্ষতিও অনেক

জোবরা গ্রামে গ্রেপ্তার আতঙ্ক, সংঘর্ষে ক্ষয়ক্ষতিও অনেক

মাথায় হাত, চোখে অশ্রু। মাঝেমধ্যে ফুঁপিয়ে কান্না। শ্রম ও ঋণে তিলে তিলে গড়ে তোলা বাস্তুভিটা হঠাৎ যেন ঝড়ে তছনছ। কোনোভাবেই মনকে বোঝাতে পারছেন না দিনমজুর মো. মঈনুদ্দিন কালন। গতকাল বুধবার দুপুরে বাড়ির উঠোনে বসে বলছিলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই আমাকে চেনে। কাউকে তো ক্ষতি করিনি। ঘরটা কেন এভাবে তছনছ করে দিল!’

শুধু কালন নন; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের হাটহাজারীর জোবরা গ্রামে এমন প্রশ্ন আরও অনেকের। গত রোববার বিকেলে শিক্ষার্থী-গ্রামবাসী সংঘর্ষে গ্রামের শতাধিক দোকান ও বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়। লুট হয় জিনিসপত্র। একটি সিএনজি অটোরিকশা ও দুটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় পাঁচটি সিএনজি অটোরিকশা ও পাঁচটি অটোরিকশা। ঘটনার উল্টো পিঠে গ্রামবাসীর ধারালো অস্ত্র, লাঠিসোটা ও ইটের আঘাতে ৪১৯ শিক্ষার্থী আহত হন। তিনজনের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক।

চট্টগ্রাম থেকে হাটহাজারী সড়ক ধরে ২০ কিলোমিটার গেলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট। সেখান থেকে ৬০০ মিটার সামনে জোবরা রেলক্রসিং। গতকাল সকালে রেলক্রসিং পার হয়ে একটু এগোতেই দেখা যায়, রাস্তার বাঁ পাশে একটি মাইক্রোবাস। গাড়িটির কোনো কাচ আস্ত নেই। এর পরেই আলমগীর স্টোর। দোকানটির গ্রিল কাটা। সামনে এগোতেই বাচা মিয়ার দোকান। সেখানকার অন্তত ১০ দোকানে আঘাতের চিহ্ন। রাস্তার পাশের ভবনগুলোর কাচের জানালা ভাঙা।

লন্ডনি বিল্ডিং এলাকা দিয়ে ইমাম বুখারী মডেল মাদ্রাসা সড়ক ধরে ঢুকতেই আহম্মদ ভিলা, প্রবাল ভিলা, এম এস টাওয়ার ও মদীনা টাওয়ারের ২৯টি জানালার কাচ এবং চারটি সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর হয়েছে। নিজের দোকানের সামনে মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিলেন নন্না মিয়া। বলছিলেন, ‘দোকানের আয়ে আমার সংসার চলে। অন্তত পাঁচ লাখ টাকার মালপত্র লুট করা হয়েছে। আমি পথে বসে গেছি।’

নন্না মিয়ার দোকান পার হতেই রাস্তার পাশে একটি ঘরের দরজায় লেখা– ‘এটা স্টুডেন্টের বাসা, সোশিওলজি ২০২৩-২৪’। স্টুডেন্ট আইডি উল্লেখ করা আছে। এটিও ভাঙচুর হয়েছে। ঘরের ভেতর থেকে এক নারী জানিয়েছেন, সংঘর্ষের সময় হামলা থেকে রক্ষা পেতে কাগজটি লাগানো হয়েছিল। এই টিনের ঘরের সব টিন কাটা।

এরপর দিনমজুর মো. মঈনুদ্দিনের ঘর। তাঁর বাড়ির টিনের ঘেরা কুপিয়ে তছনছ করা। কাটা হয়েছে ঘরের ভেতরে খাটও। তাঁর স্ত্রী তসলিমা আক্তার জানান, হামলার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। অনেক কষ্ট করে ঘর করেছি। ঘরটা ভাঙছেন কেন? আমার ছোট বাচ্চাগুলো ভয় পাচ্ছে। ওরা বলতেছে, তোমার স্বামী-সন্তানকে ভালো করে শিক্ষা দিও।’

মো. মঈনুদ্দিন বলেন, ‘এখনও এক লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ। একটা ভ্যানগাড়ি আছে। সেটি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। টাকার অভাবে গাড়িটি মেরামত করতে পারছি না। এখন কী করব, জানি না।’

মঈনুদ্দিনের ঘর পার হয়েই সাজেদা বেগমের বাড়ি। তাঁর সাতটি গরুর দড়ি কেটে দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি আর পাওয়া যায়নি। তাঁর খড়ের গাদায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ছাইয়ের স্তূপ এখনও পড়ে আছে। তিনি বলেন, ‘নিয়ে যাওয়ার সময় একটা গরু ছুটে বাড়িতে চলে আসে। আর দুইটা গরু সোহরাওয়ার্দী হলের মোড়ে নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকেও একটা ছুটে চলে আসে। আর একটা গরু বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে আমরা নিয়ে আসি। খড়ের গাদা পুড়িয়ে দেওয়ায় এখন গরুর কোনো খাবার নেই।’

সাজেদা বেগমের বাড়িতেই ইদ্রিস হোসেন ও নুর হোসেনের দুটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নুর হোসেন বলেন, ‘হঠাৎ কয়েকশ শিক্ষার্থী এসে ভাঙচুর শুরু করে। আমার কোলে তিন বছরের নাতি ছিল। তাকে পাশের পুকুরে ছুড়ে মারে। পানি কম থাকায় রক্ষা পেয়েছে।’ তাঁর ভাতিজার ঘরের ফ্রিজ থেকে মাছ ও মাংস নিয়ে যাওয়ার দাবিও করেন তিনি।

জানতে চাইলে ১১ নম্বর ফতেপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মুছা সিদ্দিকী বলেন, ‘গ্রামের বাড়িঘরের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। লুট হওয়া গরু ফেরত পেয়েছেন। অন্য জিনিসগুলো গ্রামবাসী ফেরত পায়নি। কয়েক দিনের মধ্যে তালিকা চূড়ান্ত করে উপজেলা প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দেব। আশা করছি, তারা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করবেন।’

সংঘর্ষের দিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরুরি বৈঠকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবিদ বলেন, ‘আমাদের কাছে একটা তালিকা আছে। এটা বিব্রতকর। গরু, সাইকেল ও জিনিসপত্র ফেরত দিয়ে আসাই ভালো।’

গ্রামে গ্রেপ্তার আতঙ্ক

মঙ্গলবার এক হাজার ৯৫ জনকে আসামি করে মামলার পর রাতে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর পর জোবরা গ্রামে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক পুরুষ এলাকা ছেড়েছেন। যারা আছেন তারাও ভয়ে আছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রামবাসীর সঙ্গে গঠিত সমন্বিত কমিটির সদস্য নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমরাও চাই দোষীরা গ্রেপ্তার হোক। কোনো নিরীহ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয়। কিন্তু মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে।’

পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা নাছের মুন্সি বলেন, ‘যাদের নামে মামলা হয়েছে তারা হয়তো ঘটনায় জড়িত। তবে অজ্ঞাতপরিচয় এক হাজার জনের তালিকায় গ্রামের অনেক নিরীহ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারে।’

ইমতিয়াজের অবস্থা অপরিবর্তিত

চার দিন ধরে নগরের বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে আছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ। তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থাপনায় নিউরোসার্জন ডা. মোহাম্মদ ইসমাইলের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।

গতকাল বিকেলে আইসিইউর দায়িত্বে থাকা এক চিকিৎসক জানিয়েছেন, স্বাভাবিক মানুষের কনশাস লেভেল থাকে ১৫। ইমতিয়াজের ১০-এর নিচে। মেডিকেল বোর্ডের শঙ্কা, তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। সিটি স্ক্যান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যদি রক্তক্ষরণ হয় তাহলে সার্জারি করতে হবে।

অবস্থার উন্নতি হওয়ায় সংঘর্ষে আহত সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী মামুন মিয়াকে আইসিইউ থেকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে। আর ঢাকায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন নাইমুল ইসলাম।

যা বললেন সেই ছাত্রী

গত শনিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্রীর সঙ্গে দারোয়ানের বচসা হয় তাঁর সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। ওই ছাত্রী জানান, শনিবার রাত ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে বাসা থেকে বের হন তিনি। পাঁচ মিনিট দূরত্বের একটি দোকানে রাতের খাবার খেয়ে ১১টা ১২ মিনিটের দিকে বাসার সামনে আসেন। ভবনের গেট তখন বন্ধ ছিল। তিনি দারোয়ানকে গেট খুলে দিতে অনুরোধ করলেও খুলে দেননি। এক পর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি করলে দারোয়ান গেট খোলেন। তিনি ঢুকতে চাইলে দারোয়ান তাঁকে গেটের পাল্লা দিয়ে ধাক্কা দেন। এক পর্যায়ে তাঁকে থাপ্পড় মারেন। তলপেটে লাথি মারেন।

ছাত্রী আরও জানান, এ সময় চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে আশপাশের লোক এসে বিষয়টি সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন। দারোয়ানকে তাদের জিম্মায় রেখে তারা বাসায় চলে যান।

তিনি বলেন, ১০ মিনিট পর তারা নেমে দেখেন, দারোয়ান দেয়াল টপকে পালিয়ে যাচ্ছেন। তখন খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট থেকে সহপাঠীরা ছুটে আসেন। তারা দারোয়ানকে ধরে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দারোয়ান স্থানীয়দের কাছে কুৎসা রটিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাতে প্ররোচিত করেন। তবে এই দারোয়ানকে মামলায় আসামি করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

যা বলছেন সেই দারোয়ান

শাহাবুদ্দিন ভবনের দারোয়ান ফজল করিম জানান, রাত ১২টার দিকে ওই ছাত্রী বাসায় আসেন। সে সময় তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ওই ছাত্রীর দরজা ধাক্কাধাক্কির শব্দে তিনি ওঠেন। দরজা খুলে দিলে তাঁকে দরজার পাল্লা দিয়ে ধাক্কা দেন। তখন এত রাতে কোথা থেকে এসেছেন জানতে চাইলে ওই ছাত্রী তাঁকে থাপ্পড় মারেন। দারোয়ান দাবি করেন, তিনি কিছু করেননি। তবে তাদের চিৎকারে লোকজন জড়ো হয়ে যায়। পরদিন বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়। দেখি এর মধ্যে চার-পাঁচজন ছাত্র আসছেন। তারা এসে দরজা খুলতে বলেন। তারা দরজা ভেঙে ঢুকতে চেষ্টা করলে তিনি দেয়াল টপকে চলে যান। শিক্ষার্থীরা তাঁকে দৌড়ে ধরার চেষ্টা করেন। এ সময় এক ব্যক্তি তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তাঁকেও তারা মারতে চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

ক্লাস-পরীক্ষা শুরু

তিন দিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা শুরু হয়েছে। গতকাল একাডেমিক কার্যক্রম সচল হলেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল কম। ৯টি বিভাগে পরীক্ষা হয়েছে। নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করে বিভিন্ন বিভাগ।

বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল আমীন বলেন, ‘এত বড় একটা ঘটনার পর আমরা শকিং পিরিয়ডের মধ্যে আছি। আশা করছি, রোববার থেকে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়বে।’

নারী অঙ্গনের খোলা চিঠি

বর্তমান পরিস্থিতিতে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ‘মোরাল পুলিশিং, ধর্ষণের হুমকি, সাইবার বুলিং ও প্রশাসনের অবহেলার’ প্রতিবাদ জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ও দেশবাসীর উদ্দেশে খোলা চিঠি পাঠ করেছে ‘নারী অঙ্গন’ নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সংগঠন। গতকাল বিকেলে কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের ঝুপড়িতে এই চিঠি পাঠ করেন নারী অঙ্গনের সংগঠক সুমাইয়া শিকদার।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular