চুয়াডাঙ্গায় সপ্তাহব্যাপী নজরুল উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য, মাদক ও অনলাইন জুয়া থেকে তরুণদের দূরে রাখার আহ্বান
নিজস্ব প্রতিবেদক : কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবতা ও বিদ্রোহের চেতনায় নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করাই নজরুল বর্ষ উদযাপনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, নজরুলের সাহিত্য ও দর্শন তরুণদের মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) চুয়াডাঙ্গা জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সপ্তাহব্যাপী নজরুল উৎসবের পুরস্কার বিতরণ ও সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘জাগো নব সৃষ্টির মহানন্দে’ প্রতিপাদ্যে নজরুল বর্ষ উদযাপন উপলক্ষে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়।
সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, মাদকাসক্তি, অনলাইন জুয়াসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর আসক্তি থেকে তরুণদের রক্ষা করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তরুণদের সৃজনশীল ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে সংস্কৃতি ও ক্রীড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দেশীয় সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য ও খেলাধুলাকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। নৌকাবাইচসহ বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের সংস্কৃতি হাজার বছরের পুরোনো ও সমৃদ্ধ। এ দেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য যুগে যুগে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে আকৃষ্ট করেছে। পর্যটক ইবনে বতুতার বাংলাদেশ ভ্রমণের বর্ণনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ভূখণ্ডের সঙ্গে বিশ্বের মানুষের যোগাযোগের ইতিহাস অনেক প্রাচীন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জীবনমুখী যাত্রা, বাউলগান, জারি-সারি ও ভাটিয়ালি গান নিয়ে দেশব্যাপী উৎসব আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী। পাশাপাশি হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম ও রাধারমনের মতো লোকসংগীতের স্রষ্টাদের গান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে মূল আলোচক ছিলেন নজরুল গবেষক ও চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. মন্সী আবু সাইফ। চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের প্রশাসক শরীফুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক লুতফুন নাহার, পুলিশ সুপার মেহেদী শাহরিয়ার ও জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুকুল কুমার মৈত্র। এ ছাড়া পৌরসভা প্রশাসক শারমিন আক্তার, জেলা কালচারাল অফিসার, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা নজরুলের সাহিত্য, সাম্য, মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা ও বিদ্রোহী চেতনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
এর আগে সকালে চুয়াডাঙ্গা সার্কিট হাউসে জেলার সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী। এ সময় নজরুল বর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও কর্মসূচিতে জেলার সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
পরে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও এনএসআইয়ের অতিরিক্ত পরিচালকের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন মন্ত্রী। সভায় মাদক নিয়ন্ত্রণ, চোরাচালান প্রতিরোধ ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের সত্যতা যাচাই করে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তা গ্রহণ ও প্রচারের ওপরও গুরুত্ব দেন।
এদিন সার্কিট হাউসে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, পূজা উদ্যাপন পরিষদ ও পূজা উদ্যাপন ফ্রন্টের নেতারা মন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
এ সময় মন্ত্রী বলেন, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর বিভাজন থেকে বেরিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির ভিত্তিতে সবাইকে একসঙ্গে বসবাস করতে হবে। মত ও পথের ভিন্নতা থাকলেও পাহাড় ও সমতলের জনগোষ্ঠী এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন আরও সুদৃঢ় করতে হবে।
তিনি বলেন, বৈচিত্র্যের মধ্যেই বাংলাদেশের শক্তি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের মাধ্যমে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের চেতনা সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে।
এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারাও সংস্কৃতিমন্ত্রী ও চুয়াডাঙ্গা জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।



