নিউজ ডেস্ক: সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো দুই ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন কাঠামোর মূল বেতন চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই থেকে কার্যকর হবে। আর ভাতা কার্যকর হবে আগামী অর্থবছর (২০২৭-২৮) থেকে। শিগগিরই নতুন স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগস্ট থেকে নতুন কাঠামোর বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বাস্তবায়ন কৌশল চূড়ান্ত করা, প্রশাসনিক আদেশ জারি, গেজেট প্রকাশ এবং প্রয়োজনীয় আইনি ও কারিগরি প্রক্রিয়ায় কিছুটা দেরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বকেয়াসহ পরিশোধ করা হবে।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো নতুন অর্থবছরের শুরু থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীরা বিগত প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। এ কারণে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করবে সরকার।
অন্তর্বর্তী সরকার নবম বেতন কাঠামো প্রণয়নের জন্য সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ গঠন করে। গত ২২ জানুয়ারি জমা দেওয়া প্রতিবেদনে কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। এতে সর্বনিম্ন ধাপে বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপে ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের মোট ব্যয় এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার মতো।
কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ইতোমধ্যে কয়েকটি বৈঠক করে নতুন বেতন কাঠামোর রূপরেখার খসড়া তৈরি করেছে। আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। এর পর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
সূত্র জানায়, বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর পৃথক বেতন কাঠামোর প্রতিবেদনও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সচিব কমিটি কমিশনের বেশ কয়েকটি সুপারিশ পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ভাতা ও অতিরিক্ত সুবিধা কমিশনের সুপারিশের চেয়ে কমানোর পক্ষে ওই কমিটি।
প্রাথমিকভাবে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নে তিন এবং দুই বছর মেয়াদে দুটি বিকল্প বিবেচনা করেছিল সরকার। তিন বছরের পরিকল্পনায় দুই অর্থবছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ করে এবং তৃতীয় বছরে ভাতা কার্যকরের চিন্তা ছিল। তবে অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, দুই ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেমে (আইবাস প্লাস প্লাস) কারিগরি জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে তারা একবারেই পুরো মূল বেতন কার্যকর করার সুপারিশ করেছে।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সমকালকে বলেন, দুই ধাপে বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করাই যৌক্তিক। কারণ, সরকারের আর্থিক সক্ষমতার পাশাপাশি বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতিরও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগেও সরকারের রাজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানোর পর কিছু অর্থ উন্নয়ন ব্যয়ে ব্যয় করা যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয়ই পুরোপুরি মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সরকারকে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির দিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
বাজেটে সংস্থান যেখানে রাখা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। পেনশন, গ্র্যাচুইটিসহ এ বরাদ্দ এক লাখ ২৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় খুব বেশি নয়। তবে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বাজেটের ‘পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের সম্পদের ব্যবহার’ অংশে ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় যা ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি। এই অতিরিক্ত অর্থের অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশনভোগীদের জন্য রাখা হয়েছে।
বর্তমানে ২০১৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন ও ভাতা পাচ্ছেন। এর পাশাপাশি প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ছিল। সামরিক বাহিনী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসহ মোট উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে মহার্ঘ ভাতা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়। তবে গত বছরের জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করা হয়। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে এ বিশেষ সুবিধা সমন্বয় করা হবে।




