প্রযুক্তিগত দক্ষতার এক অসাধারণ প্রদর্শনীতে, প্রথমবারের মতো আয়োজিত এশিয়া-প্যাসিফিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অলিম্পিয়াডে (এপিওএআই) ৩টি স্বর্ণ পদক লাভ করেছে বাংলাদেশ। চীন, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান ও ইরানের মতো প্রযুক্তিতে শীর্ষস্থানীয় দেশ সহ এই অঞ্চলের মোট ১৮টি দেশের ১২৯ জন প্রতিযোগীদের সঙ্গে লড়াই করে দেশের তিন শিক্ষার্থী সোনার পদক পেয়েছে।
প্রতিযোগিতায় প্রদত্ত মাত্র ১০টি স্বর্ণপদকের মধ্যে বাংলাদেশ এককভাবে তিনটি পদক জয় করে, যা অংশগ্রহণকারী যেকোনো দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী স্বর্ণপদক বিজয়ীরা হলেন হোমনা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র লবিব শাহরিয়ার; মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র মো. শাহদোজ্জামান আরাফ এবং নটরডেম কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র ত্রিদিব রায় অর্জো। এপিওএআই ২০২৬-এর চূড়ান্ত র্যাঙ্কিংয়ে তারা যথাক্রমে চতুর্থ, পঞ্চম ও নবম স্থান অর্জন করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করেছে।
এছাড়াও, প্রশংসনীয় পারফরম্যান্সের জন্য আরও চারজন বাংলাদেশী প্রতিযোগী সম্মানসূচক স্বীকৃতি লাভ করেছে: নওফিল রহমান (অষ্টম শ্রেণি, দারুস সালাম সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়), নায়রা নাওয়ার আহমেদ (একাদশ শ্রেণি, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল), অনন্য জারিফ আকন্দ (একাদশ শ্রেণি, মুন্নু ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ) এবং মবতাসিম চৌধুরী প্রিয়ম (একাদশ শ্রেণি, নটরডেম কলেজ)। আট সদস্যের দলের শেষ সদস্য, মুর্তজা আবদুল্লাহ (দশম শ্রেণি, ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল), পুরো প্রতিযোগিতা জুড়ে প্রাণবন্ত লড়াই করেছে।
৬-ঘণ্টার এই প্রতিযোগিতাটি ১৩ই জুন, দুপুর ১২টায় (বিএসটি) শুরু হয়। আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করে, কঠোর লাইভ ভিডিও প্রক্টরিং এবং স্ক্রিন-রেকর্ডিং নজরদারির অধীনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট (আইআইটি) থেকে ৮টি বাংলাদেশী দল অনলাইনে অংশগ্রহণ করে। প্রতিযোগীরা ‘বোহরিয়াম’ প্ল্যাটফর্মে চারটি জটিল, ডোমেইন-নির্দিষ্ট মেশিন লার্নিং সমস্যা সমাধানের জন্য সময়ের সাথে পাল্লা দেন।
অত্যন্ত গর্ব প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট (আইআইটি)-এর পরিচালক ও দলনেতা অধ্যাপক ড. বি. এম. মাইনুল হোসেন বলেন, “এই অসাধারণ ফলাফল আমাদের মধ্যে বিপুল আশা জাগিয়েছে। বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার মাঝেও আমাদের নিরন্তর প্রচেষ্টা এই শিক্ষার্থীদের অনবদ্য পারফরম্যান্সের মাধ্যমে সার্থকতা পেয়েছে। এটি শুধু একটি স্থানীয় বিজয় নয়; এটি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক উপস্থিতির এক জোরালো ঘোষণা। বাধা-বিপত্তি যাই হোক না কেন, আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উন্নত এআই প্রশিক্ষণ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখতে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
দলের কোচ এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজম খান এই বিজয়ের পেছনের কঠিন যাত্রার ওপর জোর দিয়ে বলেন, “আমাদের শিক্ষার্থীদের অক্লান্ত পরিশ্রম, দৃঢ়তা এবং নিজেদের সেরাটা দেওয়ার অটল সংকল্পই এই ঐতিহাসিক অর্জনের মূল ভিত্তি। আমরা শুধু অংশগ্রহণই করিনি; আমরা সফলভাবে এআই এবং মেশিন লার্নিং-এ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত নেতৃত্বকে তুলে ধরেছি। আমি বিশ্বাস করি, এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে ব্যাপক আন্তর্জাতিক সাফল্যের পথ প্রশস্ত করবে।”
পরীক্ষাটির প্রযুক্তিগত প্রেক্ষাপট বিশদভাবে বর্ণনা করতে গিয়ে বাংলাদেশ দলের অ্যাকাডেমিক কো-অর্ডিনেটর তাসনিম মাহফুজ নাফিস বলেন, “প্রশ্নগুলো চারটি অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ ক্ষেত্র—জ্যোতির্বিজ্ঞান, অডিও প্রসেসিং, বন্যপ্রাণীর চিত্রগ্রহণ এবং রসায়ন—জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, একজন উচ্চ বিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষার্থী যে ক্ষেত্রেই ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখুক না কেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডেটা হ্যান্ডলিং-এ দক্ষতা তাদেরকে অনেকখানি এগিয়ে দেবে। উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি পাইথন প্রোগ্রামিং-এর প্রাথমিক জ্ঞান রাখে, তবে তারা ক্যাগল প্ল্যাটফর্মে বাস্তব মেশিন লার্নিং সমস্যা নিয়ে কাজ করতে পারবে। এমনকি এক দশক আগেও এটি সম্ভব ছিল না।”




