নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত মানুষদের কল্যাণে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া পেশেন্টস এন্ড প্যারেন্টস ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন (BTPWAJ”।
শনিবার (১০ মে ২০২৫)জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন হলে এই উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠীত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রফেসর ডা. বেলায়েত হোসেন, উপদেষ্টা, BTPWA এবং প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট। আনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কামরুন নাহার মুকুল।
ডা. বেলায়েত হোসেন বলেন, হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফরেসিস নামক রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া বাহক শনাক্তকরণ এবং বাহকে বাহকে বিবাহ বন্ধ করা থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের সহজতম উপায়। আবার দুজন বাহকের মধ্যে বিবাহ হয়ে গেলেও তাদের অনাগত সন্তান যেন থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নিতে না পারে সেজন্য গর্ভস্থ ভ্রূণের প্রি- ন্যাটাল ডায়াগনোসিস পরীক্ষার মাধ্যমে গর্ভের সন্তান থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত কিনা তা নিশ্চিত হওয়া থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের আরেকটি উপায়।
কামরুন নাহার মুকুল বলেন, “ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমি গত দুই দশক ধরে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। এই সংগঠনের মাধ্যমে আমরা আরও সুসংগঠিতভাবে সারা দেশে কাজ করতে পারবো।” তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা ও সহকর্মীদের একত্রিত করে গঠিত হয়েছে এই সংগঠন। এই সংগঠনটির লক্ষ্য থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জীবনমান উন্নয়ন সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। পাশাপাশি রোগীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করা।
STPWA একটি সরকারি অনুমোদিত, অরাজনৈতিক ও অলাভজনক সংগঠন যা ব্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত। সংগঠনটি সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ১৯ মার্চ ২০২৫ তারিখে নিবন্ধিত হয়েছে। নিবন্ধন নম্বর – ০১০০৮৭)।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর ডা. এবিএম ইউনুস, সাবেক চেয়ারম্যান হেমাটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি প্রফেসর ডা. একেএম আমিরুল মোরশেদ খসরু মহাসচিব, শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ। প্রফেসর ডা. রেজা অধ্যাপক, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি, ডা. মো: আদনান, সেক্রেটারি জেনারেল হেমাটোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ, সহযোগী অধ্যাপক হেমাটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হয়েও সংগ্রামী জীবন অতিবাহিত করা বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের থ্যালাসেমিয়া সেন্টারে কাউন্সেলর হিসেবে কর্মরত আছেন। অনুষ্ঠানে জানানো হয় BTPWA ইতোমধ্যে গত চার বছরে থ্যালাসেমিয়া রোগী ও তাঁদের অভিভাবকদের নিয়ে তিনটি মিলনমেলা আয়োজন করেছে এবং ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বেশকিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ও অফিসে সচেতনতামূলক সেমিনার ও থ্যালাসেমিয়া বাহক শনাক্তকরণ কর্মসূচি আয়োজন করেছে।
সংগঠনটি নিয়মিত অনলাইনে ঢাকার বাইরের রোগীদের জন্য রক্তরোগ বিশেষজ্ঞগণকে নিয়ে ডাক্তারি পরামর্শবিষয়ক অনুষ্ঠান আয়োজন করে। এছাড়াও তারা ঈদ ও শীতে উপহার সামগ্রী বিতরণ, থ্যালাসেমিয়া কাউন্সেলিং ও যাকাত ফান্ডের মাধ্যমে সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
সরকারের কাছে সংগঠনটির দাবী:
বাংলাদেশের প্রতিটি রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য বিনামূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে সকল প্রকার ঔষধ প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ।
সরকারিভাবে বাংলাদেশের সকল থ্যালাসেমিয়া রোগীর রেজিস্ট্রেশন এবং পরিচয়পত্র প্রদান। এছাড়াও সকলের জাতীয় পরিচয়পত্রে ব্লাডগ্রুপের পাশাপাশি হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফরেসিস রিপোর্ট বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তকরণ।
প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে অন্তত ২টি বেড সহযোগে থ্যালাসেমিয়া কর্ণার স্থাপন।
দেশের সকল জনগণকে বাহক পরীক্ষা (হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফরেসিস টেস্ট) বাধ্যতামূলক করা। বিশেষ করে স্কুল কলেজে ভর্তির সময় ছাত্রছাত্রীদের জন্য হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফরেসিস টেস্ট বাধ্যতামূলক করা।
প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ডিএনএ ল্যাব স্থাপন এবং প্রিন্যাটাল ডায়াগনোসিস-এর সুযোগ বাড়ানো।
থ্যালাসেমিয়া রোগীদেরকে প্রতিবন্ধী আইন ২০১৩ তে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা
করা।
সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সমাজের নেতিবাচক ও ভ্রান্ত ধারণা দূর করা এবং থ্যালাসেমিয়ামুক্ত বাংলাদেশ গড়া।
আন্তর্জাতিক থ্যালাসেমিয়া দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক, সমাজসেবী নেতৃবৃন্দ এবং থ্যালাসেমিয়া রোগী ও তাঁদের পরিবারবর্গ। BTPWA আশাবাদী যে, সরকারের সহযোগিতা ও দেশের সচেতন জনগণের সহায়তায় থ্যালাসেমিয়ার মত একটি কঠিন কিন্তু শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য রোগ মোকাবেলায় তারা ভবিষ্যতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।



