আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, চরম আবাসন সংকট, কম মজুরি এবং শিক্ষা খাতে বরাদ্দের অভাব এসবের প্রতিবাদে ইউরোপজুড়ে রাজপথে নেমেছেন লাখো সাধারণ মানুষ।
ফ্রান্সসহ বেশ কিছু দেশে এই বিক্ষোভ যখন তীব্র রূপ নিচ্ছে, তখনই সামনে এসেছে বিভিন্ন দেশের সরকারের বিশাল ঋণের বোঝা ও সুদ পরিশোধের গ্লানি। ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসেই বিশ্বজুড়ে সরকার, পরিবার ও করপোরেট খাতের মোট ঋণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ছাড়িয়েছে।
ঋণের এই আকাশচুম্বী সুদ মেটাতেই এখন ফুরিয়ে যাচ্ছে সিংহভাগ বাজেট। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পেনশনের মতো জনকল্যাণমূলক খাতগুলোতে ব্যয়ের সুযোগ দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আরও উসকে দিচ্ছে।
বিশ্বের ঋণের বোঝা কতটা বেড়েছে, কোন কোন দেশ সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত এবং সুদ বাবদ কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা তুলে ধরা হলো।
সরকারগুলো কীভাবে অর্থ ধার করে?
সরকারও মানুষের মতো ঋণ নেয়। তবে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার বদলে সরকার বন্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করে। এর বিনিময়ে বিনিয়োগকারীদের সুদ দেয় এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ক্ষেত্রে সরকার এক দশক পর ঋণ পরিশোধ করে। এই বন্ডের ইল্ড বা মুনাফার হার থেকে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ধারণা পাওয়া যায়।
ঋণ গ্রহণ ব্যয়বহুল হলে কী হয়?
বন্ডের দাম কমলে সুদের হার বাড়ে। ফলে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়ে যায়। এতে সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সড়কের মতো খাতে বরাদ্দ কমানোর চাপ তৈরি হয়।
২০১০-১২ সালের ইউরো জোন ঋণসংকটে গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের ঋণ গ্রহণের খরচ বেড়েছিল। বর্তমানে ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি ঋণের সুদের হার প্রায় ৫ শতাংশ, যেখানে জার্মানির ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। ঋণসংকটে থাকা ইতালি ও গ্রিসের চেয়েও এখন ফ্রান্সের ঋণ গ্রহণের খরচ বেশি।
কোন দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত?
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ ৪১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১২৭ শতাংশ। এর পর রয়েছে চীন, যার ঋণ ২২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। জাপানের ঋণ ৮.৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১৯৯ শতাংশ– প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ফ্রান্সের সরকারি ঋণ ৪.২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১১৮.৫ শতাংশ। ঋণের পরিমাণে দেশটি বিশ্বে পঞ্চম। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ ফ্রান্সের ঋণ জিডিপির ১২১.৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে, জার্মানির সরকারি ঋণ ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৬৫ শতাংশ।
ট্রিলিয়ন ডলারের সুদ বিল
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বে সরকার, পরিবার ও কোম্পানির মোট ঋণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স (আইআইএফ)। মাথাপিছু হিসাবে এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। এদিকে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো গত এক বছরে সরকারি বন্ডের সুদ বাবদ ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। এই ব্যয় প্রতিরক্ষা খাতে বিশ্বের মোট ব্যয়ের চেয়েও বেশি। ঋণের সুদ মেটাতে সরকারের ব্যয় বাড়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পেনশনের মতো খাতে বরাদ্দ কমতে পারে। পাশাপাশি বাড়তে পারে কর ও ব্যক্তিগত ঋণের সুদের হার।
সূত্র: আল জাজিরা



