সৈয়দা নার্গিস
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছোটবেলায় সিরিয়া সফরের সময় যে গাছের নিচে বিশ্রাম নিয়েছিলেন বলে প্রচলিত রয়েছে, তাকে ‘সাহাবী গাছ’ বা ‘The Blessed Tree’ বলা হয়।
গাছের পরিচয় ও অবস্থান
- অবস্থান: এই পিস্তাচিও (Pistachio) গাছটি জর্ডানের উত্তরাঞ্চলে সাফাবি (Safawi) মরুভূমির আল-বুকায়উইয়্যা (Al-Buqayawiyyah) এলাকায় অবস্থিত।
- ঐতিহাসিক পটভূমি: প্রায় ১৪০০-১৫০০ বছর আগে (৫৮২ খ্রিস্টাব্দের দিকে) ১২ বছর বয়সে চাচা আবু তালিবের সাথে বাণিজ্যিক কাফেলায় সিরিয়া যাওয়ার পথে নবীজি (সা.) এই গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিয়েছিলেন। তখন বহিরা (Bahira) নামের এক খ্রিস্টান পাদ্রী সেখানে তরুণ নবীজির মধ্যে নবুওয়তের চিহ্ন দেখতে পেয়েছিলেন বলে ইতিহাসে বর্ণিত আছে।
ইসলামী আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতা
- জীবিত থাকার দাবি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয় যে, গাছটি অলৌকিকভাবে আজও জীবিত রয়েছে এবং একে ‘জীবিত সাহাবী’ বলা হয়।
- আলেমদের মত: ইসলামিক স্কলার ও ফতোয়া বোর্ডগুলোর মতে, কোনো গাছ অলৌকিকভাবে আজও বেঁচে আছে কিংবা সেখানে গিয়ে বরকত (বারাকা) তালাশ করা বা জিয়ারত করা ইসলামসম্মত নয়।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) এমন কোনো ঐতিহাসিক স্থানের অতিরিক্ত পবিত্রতা বা শিরক হওয়ার আশঙ্কায় বাইয়াতের গাছটি কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
হাদিস ও ঐতিহাসিক বর্ণনা
ছবিতে যে গাছটি দেখা যাচ্ছে তা কোন সাধারণ গাছ নয়। এই গাছটি এখন থেকে প্রায় ১৫০০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক সাহাবী গাছ !
সুনানে তিরমিজি (হাদিস নং ৩৬২০) এবং মুসনাদে আবি ইয়ালা-তে সাহাবি হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে এই ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে।
৫৮২ খ্রিস্টাব্দে মহামানব হযরত মুহাম্মদ (স.) এর বয়স যখন ১২ বছর। তখন তিনি তার চাচা আবু তালিবের সাথে বাণিজ্য করতে মক্কা থেকে শাম দেশ বর্তমান সিরিয়ার উদ্দেশ্য যাত্রা করেন।
যাত্রাপথে তারা সিরিয়ার অদূরে জর্ডান এসে উপস্থিত হন। এই এলাকাটি তখন ছিল শত শত মাইলব্যাপী উত্তপ্ত বালু কণাময় মরুভূমি। চাচার সাথে রাসুল (স.) মরুভুমি পাড়ি দিতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তারা একটু বিশ্রামের সন্ধান করছিলেন কিন্তু আশপাশের কোনো গাছ বা ছায়া পাচ্ছিলেন না।
তখন তারা কিছু দূরে পাতাবিহীন মৃত প্রায় একটি গাছ দেখতে পেলেন। এই গাছটির নিচে কেউ বসতে পারতো না। কিন্তু কোন উপায় না পেয়ে ক্নান্ত নবীজি ও তার চাচা মৃত প্রায় পাতাহীন গাছটির নীচে বসেন বিশ্রাম নিতে। আল্লাহ তা’য়ালার রহমতে তখুনি সবুজ পাতায় ভরে যায় গাছটি।
এই ঘটনা দূর থেকে দেখেন জারজিস ওরফে বুহাইরা নামের একজন খৃষ্টান পণ্ডিত। তিনি নবীজির চাচার কাছে এসে বললেন আমি এতদিন এখানে আছি কেউ এই গাছের নিচে বসতে পারেনি এবং এই গাছের কোন পাতা ছিল না।
খৃষ্টান পন্ডিত জিজ্ঞেস করলেনঃ- এই ছেলেটির নাম কি ?
চাচা বললেন, মোহাম্মদ!
তিনি আবার জিজ্ঞস করলেনঃ- তার বাবার নাম কি ?
নবীজির চাচা উত্তর দিলেন আব্দুল্লাহ !
তিনি আবার জিজ্ঞসে করলেনঃ- তার মাতার নাম ক ?
চাচা এবার জবাব দিলেন আমিনা !
বালক মুহাম্মাদ (সা.) কে দেখে, তার সাথে কথা বলে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন পাদ্রীর চিনতে আর বাকী রইলো না যে এই সে বহু প্রতিক্ষীত শেষ নবী, ইতিহাসের গতি পরিবর্তকারী, আরবসহ সমগ্র পৃথিবী থেকে পৌত্তলিকতার বিনাশকারী, একত্ববাদকে শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠাকারী। সাথে সাথে খৃষ্টান পন্ডিত বললেন, আমি পড়েছি ইনি হলেন ইসলাম ধর্মের শেষ নবী হযরত মোহাম্মাদ (সা.)।
আল্লাহ তা’আলার ইশারায় সাহাবী গাছটি নবীজিকে নিরাপদ আশ্রয় দান করেছিল। আজও সেই গাছটি বেঁচে আছে। এই গাছটি “একমাত্র জীবিত সাহাবী গাছ” হিসাবে পরিচিত! এই গাছটির নিচে এর আগে কখনো কেউ বসতেও পারেনি!
এই গাছটির অলৌকিকতা মনে করিয়ে দেয় সৃষ্টিকর্তা বলে একজন আছেন। তাঁরই রহমতে বেঁচে আছে গাছটি। কালের পর কাল, যুগের পর যুগ শত শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে একটি গাছ। যার নাম সাহাবী গাছ। পৃথিবী সৃষ্টির পর নানা রকম অলৌকিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেছেন মহান আল্লাহ সোবহানা তাআলা।
সেই সৃষ্টির পুনরাবৃত্তির অংশ হচ্ছে ঐতিহাসিক সাহাবী গাছ। ইংরেজিতে এই গাছটিকে বলা হয় the blessed tree। ভাবা যায় চারদিকে ধু ধু মরুভূমির বুকে দাঁড়িয়ে আছে একটি গাছ ৷ সাহাবী গাছটির আশেপাশে শত বর্গ কিলোমিটার জুড়ে কোন গাছ পালার অস্তিত্ব না থাকলেও এই গাছটি এখনো বেচেঁ আছে। পৃথিবীতে এত পুরনো কোনো গাছ এখনো বেঁচে আছে তা বিশ্বাসযোগ্য না হলেও এটি একটি সত্য ঘটনা।
অবিশ্বাস্য এই গাছটি আছে জর্ডানের মরুভূমির প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাফাঈ এলাকায়। জর্ডানের বাদশা দ্বিতীয় আব্দুল্লাহ এই স্থানটিকে পবিত্র স্থান হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং স্থানটিকে বিশেষভাবে সংরক্ষণ করেন।
বিশেষ দিনেগুলোতে প্রচুর লোক সমাগম ঘটে গাছটি দেখার জন্য। সাহাবী গাছটিকে কেন্দ্র করে এখানে আগতরা গাছের নিচে নামাজ আদায় করে থাকেন। প্রচুর লোক সমাগম হলে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করে থাকেন তারা। এছাড়াও ধু ধু মরুভূমির বুকে সাহবী গাছের তলাটি সুশিতল বিশ্রামের স্থান। যা মানুষের মনে প্রশান্তি এনে দেয়।
লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক



