পঞ্চগড় প্রতিবেদক: পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় পাকা সড়ক নির্মাণে শিডিউল বহির্ভূত নিম্নমানের ইট ব্যবহারের অভিযোগে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী, সার্ভেয়ার ও স্থানীয় মানুষজনকে মারধর করা, প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করা ও নানাভাবে হেনস্তা করার ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন দেবীগঞ্জ উপজেলা শ্রমিক লীগের নেতা ও সড়কের সাব ঠিকাদার শাহীনুর রহমান শাহীন (৩৩) — এমন অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বড়শশী ইউনিয়নের মৌলভীপাড়া জামে মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় ঘটনাটি ঘটে।
ঘটনার খবর পেয়ে বোদা থানা পুলিশের একটি দল শাহীনসহ তার ৩/৪ জন শ্রমিককে প্রথমে থানায় নিয়ে আসে। পরে শ্রমিকদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হলেও আটক করা হয় শাহীনকে। এরপরে মঙ্গলবার রাতে বোদা উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের সার্ভেয়ার মো. হজরত আলী বাদী হয়ে শাহীনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৫/৬ জনকে আসামি করে বোদা থানায় মামলা করেছেন। ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বুধবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, ঘটনাস্থল থেকে সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ১০০ পিছ ইট আলামত হিসেবে জব্দ করেছে পুলিশ।
সাব ঠিকাদার শাহীনের বাড়ি দেবীগঞ্জ উপজেলার চিলাহাটি ইউনিয়নের ভাউলাগঞ্জ এলাকায়। তিনি উপজেলা ট্র্যাক্টর মালিক সমিতির সভাপতি ও শ্রমিক লীগের রাজনীতিতে জড়িত বলে জানিয়েছেন, দেবীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও চিলাহাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ। শাহীন তার চাচাতো ভাই বলেও জানান তিনি।
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বোদা উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নের মহিষবাথান-ভাউলাগঞ্জ ভায়া নায়েকপাড়া মোড় পর্যন্ত ৭৪৭ মিটার কাঁচা রাস্তা পাঁকা করার কার্যাদেশ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স ভাই বোন ট্রেডার্স’। তবে চুক্তি অনুযায়ী কাজটি সাব-ঠিকাদার হিসেবে বাস্তবায়ন করছিলেন দেবীগঞ্জ উপজেলার ভাউলাগঞ্জ এলাকার মেসার্স দুলাল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. শাহীনুর ইসলাম শাহীন।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) দুপুরে বড়শশী ইউনিয়নের মৌলভীপাড়া জামে মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় নির্মাণাধীন রাস্তার দুই ধারের এজিং-এ নিম্নমানের ৩ নম্বর ইট ব্যবহার করার খবর পেয়ে বোদা উপজেলা প্রকৌশলী মো ফিরোজুর রহমান এবং সার্ভেয়ার মো হজরত আলী সরেজমিনে পরিদর্শনে যান। ঘটনাস্থলে নিম্নমানের কাজের সত্যতা পেয়ে কর্মকর্তারা কারণ জানতে চাইলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন সাব ঠিকাদার শাহীনুর ইসলাম।
এ সময় তিনি এবং তার সাথে থাকা ৫/৬ জন সহযোগী এলজিইডি কর্মকর্তাদের ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন। একপর্যায়ে উপস্থিত কর্মকর্তা ও স্থানীয় লোকজনকে উদ্দেশ্য করে শাহীন হুমকি দিয়ে বলেন, আমরা যেমন ইচ্ছা তেমন করে রাস্তার কাজ করব। কেউ বাধা দিতে আসলে জানে মেরে ফেলব।
ঠিকাদারের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দেখে স্থানীয় এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে উপজেলা প্রকৌশলী বোদা থানা পুলিশকে খবর দিলে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ।
এদিকে, পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে শাহীনের সহযোগীরা পালিয়ে গেলেও সাব ঠিকাদার শাহীনুর ইসলাম শাহীন ও তার ৩/৪ জন শ্রমিককে পুলিশি হেফাজত নিয়ে আসা হয়। পরে বোদা উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের সার্ভেয়ার মো. হজরত আলী বাদী হয়ে একটি মামলা করেন।
মামলার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বোদা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) তপন কুমার রায় ঘটনাস্থলের মিনারুল ইসলামের বাড়ির খোলা জায়গা থেকে রাস্তা নির্মাণে ব্যবহারের জন্য আনা ১০০ পিস নিম্নমানের ইট (যাতে MMR2 লেখা রয়েছে) জব্দ আলামত হিসেবে সংরক্ষণ করেন।
উপজেলা প্রকৌশলী ফিরোজুর রহমান জানান, ‘নিম্নমানের ইট দিয়ে এজিং করায় ওই সাব ঠিকাদারকে আগেও সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি কথা না শুনে ইচ্ছেমতো কাজ চালিয়ে যাওয়ায় এলাকাবাসী প্রতিবাদ জানাতে গেলে ঠিকাদারের লোকজন উল্টো দুর্ব্যবহার করে। পরে আমরা গেলে আমাদের সাথেও খারাপ আচরণ করেন। সে সসয় পরিস্থিতি বেগতিক হওয়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমাদের পুলিশের সহায়তা নিতে হয়েছে। আমরা একটি মামলা করেছি।’
এলজিইডির পঞ্চগড় নির্বাহী প্রকৌশলী মাইনুল ইসলাম জানান, ‘সরকারি রাস্তার কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারসহ দায়িত্বরত কর্মকর্তা ও স্থানীয় লোকজনের সাথে খারাপ আচরণ করায় মামলা হয়েছে। কেউ কোনো অনিয়ম করলে আমরা একচুলও ছাড় দেব না।’
বোদা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোয়েল রানা বলেন, ‘সরকারি কাজে বাধা, অর্থ অপচয়, প্রতারণা ও হুমকির দায়ে মামলাটি রুজু করা হয়েছে। প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। মামলার তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।’




