ঢাকা  শুক্রবার, ১৭ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeঅর্থনীতিমুদ্রানীতিতে সুদহার বাড়েনি: ৯.৫ শতাংশই থাকছে

মুদ্রানীতিতে সুদহার বাড়েনি: ৯.৫ শতাংশই থাকছে

অর্থনীতি ডেস্ক: মূল্যস্ফীতি কমলেও এর অন্তর্নিহিত ঝুঁকি এখনো উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে থাকায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অক্টোবর-ডিসেম্বর-২০২৬ প্রান্তিকের নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সতর্ক অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কমলেও দীর্ঘমেয়াদে তা নিয়ন্ত্রণে আসার যথেষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা, দেশে নিয়ন্ত্রিত জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয় এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এ অবস্থায় আগেভাগে মুদ্রানীতি শিথিল করা হলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বেড়ে যেতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রায় ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গতকাল বুধবার বিকেলে নতুন প্রান্তিকের মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সময় এসব তথ্য জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান।

অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণায় ড. হাবিবুর রহমান বলেন, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) হার ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে।

নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার বিষয়ে সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতির সূচনা ইতিবাচক। তবে তিন মাস পরপর নীতি ঘোষণা করাই সাফল্য নয়। আসল পরীক্ষা হবে মূল্যস্ফীতি কমানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করা। ব্যাংক খাতের গভীর সংস্কার ছাড়া সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিনই থেকে যাবে।

মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে নেমে আসায় সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে রয়েছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয়সংক্রান্ত চাপ পুরোপুরি কমেনি।

এর সঙ্গে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাবে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। পাশাপাশি জাতীয় বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নও মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে মুদ্রানীতিতে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে।

তবে একই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। ওই সময়ে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির মতো সূচকগুলো গত অর্থবছরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মন্থরতা নির্দেশ করছে।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে বিভিন্ন খাতে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ এবং কৃষি, ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মুদ্রানীতি শিথিল করার পর আর্থিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। গত ২ আগস্ট থেকে নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হয়। এরপর আন্তব্যাংক সুদহার ও সরকারি সিকিউরিটিজের ইল্ড কমেছে।

তবে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা ও ঋণ বিতরণ এখনো দুর্বল। ২০২৬ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বিনিয়োগে মন্থরতা, ঋণগ্রহীতাদের উচ্চ ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এর অন্যতম কারণ।

এদিকে ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা, মূলধন পুনরুদ্ধার এবং ঋণ শৃঙ্খলা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ওই অর্থবছরে ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।

তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মূলত আর্থিক হিসাবের ঘাটতি এর জন্য দায়ী।

এ সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। পাশাপাশি বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা মিলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী অর্থবছরে অর্থনীতির দ্রুত পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে ধীরগতির পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা করছে। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে ভিন্নতা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের আগের ৪ দশমিক ৩ শতাংশের পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে।

আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে পারে বলে ধারণা করা হলেও এর গতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

মুদ্রানীতিতে আগামী দিনের অর্থনীতির জন্য কয়েকটি প্রধান ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য, কঠোর বৈশ্বিক মুদ্রানীতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা।

এ ছাড়া রাজস্ব খাতের চাপ, জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত না করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করাই এখন মুদ্রানীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular