লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি: লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় দুই হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। গত ১৫ মে কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধের নোটিশ দেওয়া হলেও শ্রমিকদের প্রায় পাঁচ মাসের বেতন এখনো পরিশোধ করা হয়নি। ব্যাংকিং জটিলতা ও আর্থিক সংকটকে কারখানা বন্ধের কারণ হিসেবে জানিয়েছে মালিকপক্ষ।
এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম নারী শ্রমিকেরা। কারখানাটি বন্ধের পর পুরুষ শ্রমিকদের কেউ কেউ অন্যত্র কাজ পেলেও নারী শ্রমিকদের বড় একটি অংশ এখনো কর্মহীন রয়েছেন।
রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের রাখালিয়া এলাকায় প্রায় দুই দশক ধরে বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজের কার্যক্রম চলছিল। কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘদিনের কর্মসংস্থান হারানোর সঙ্গে বকেয়া বেতন না পাওয়ায় শ্রমিকদের অনেক পরিবারে দেখা দিয়েছে আর্থিক সংকট।
ফাহিমা বেগম (ছদ্মনাম) তাঁদেরই একজন। প্রায় আট বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর এক ছেলে, এক মেয়ে ও বৃদ্ধা মায়ের দায়িত্ব নেন তিনি। স্বজনদের সহযোগিতায় মাসে ছয় হাজার টাকা বেতনে বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজে কাজ শুরু করেন। ওই আয়েই চলছিল তাঁর সংসার।
কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফাহিমার সেই আয়ের পথও বন্ধ হয়েছে। পাঁচ মাসের বেতন বকেয়া থাকায় পাওনা টাকাও পাননি তিনি। সন্তান ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর।
গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) কারখানার সামনে অন্তত ১৫ জন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের অনেকের অবস্থাই একই। কেউ স্বামী বা বাবা হারিয়েছেন, আবার কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দীর্ঘদিন কাজ না থাকায় অনেকের জমানো টাকাও প্রায় শেষ হয়ে গেছে।
সোনাপুর এলাকার শ্রমিক জরিনা বেগম বলেন, পুরুষ শ্রমিকদের অনেকে অন্য জায়গায় কাজ পেয়েছেন। কিন্তু যুবতী ও মধ্যবয়সী নারী শ্রমিকদের জন্য কাজের সুযোগ কম। তিনি বলেন, বিসিক শিল্পনগরীতেও যোগাযোগ করেছেন, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হয়নি। বিধবা ও একার আয়ে চলা নারীদের জন্য পরিস্থিতি খুব কঠিন।
শ্রমিক মো. রকিব, হাসিফ, রহিম ও জহির মিঝি বলেন, এতদিন জমানো টাকা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালিয়েছেন। এখন সেই সঞ্চয়ও প্রায় শেষ। এলাকায় নতুন কাজের সুযোগও কম।
কারখানা চালু এবং বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে এর আগে শ্রমিকেরা সড়কে নেমে বিক্ষোভও করেন।
কারখানা বন্ধের বিষয়ে বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী টিপু সুলতান ও সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) বিপ্লব পাল মুঠোফোনে বলেন, গত ২০ বছর ধরে লাভ-ক্ষতির হিসাব মিলিয়ে তাঁরা কারখানাটি চালিয়ে আসছিলেন। ব্যাংক-টু-ব্যাংক এলসি সুবিধা বন্ধ হওয়া ও ব্যাংকিং জটিলতার কারণে তাঁরা কারখানা চালাতে সমস্যায় পড়েছেন।
তাঁরা আরও বলেন, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁদের অনুরোধ, ব্যাংকিং সুবিধা পুনরুজ্জীবিত করে লে-অফ তুলে নিয়ে কারখানাটি পুনরায় চালুর সুযোগ দেওয়া হোক।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, ব্যাংক সুবিধাজনিত সংকটের কারণেই কারখানাটি বন্ধ হয়েছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়ে কয়েক দফা বৈঠক করা হলেও শেষ পর্যন্ত মালিকপক্ষ কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করে।
বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন রায়পুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মারুফ বিন জাকারিয়া। তিনি বলেন, হাজারো পরিবারের স্বচ্ছলতা এই কারখানার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এটি বন্ধ হওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। কর্মসংস্থান রক্ষায় সরকারের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কারখানাটি বন্ধ হওয়ায় শ্রমিকদের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়ছে। দ্রুত কারখানা চালু এবং শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা না হলে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।




