ঢাকা  বৃহস্পতিবার, ১১ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৫শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeআন্তর্জাতিকরাশিয়ায় পড়ে আছে জুলাই যোদ্ধার লাশ

রাশিয়ায় পড়ে আছে জুলাই যোদ্ধার লাশ

পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্রদলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন ইয়াসিন মিয়া শেখ। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে সক্রিয় ছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও। স্বৈরাচার পতনের পর ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় দেশে ছেড়ে পাড়ি জমান রাশিয়ায়। সেখানে একটি কোম্পানিতে কয়েকমাস চাকরি করার পর চুক্তিভিত্তিক যোদ্ধা হিসেবে যোগ দেন রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে।

গত ২৭ মার্চ যুদ্ধ চলাকালেন মিসাইল হামলায় প্রাণ হারান তিনি। এরপর কেটে গেছে প্রায় দুই মাস। কিন্ত এখনো‍ দেশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সক্রিয় সৈনিক ইয়াসিনের লাশ দেশে ফেরত আনতে পারেনি পরিবার।

ইয়াসিনের মা ফিরোজা বেগমের একটাই আকুতি ছেলের লাশটা যেন দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করে দেয় সরকার। আর ঋণের চাপে দিশাহারা বড় ভাই রুহুল আমিন শেখ চেয়েছেন ক্ষতিপূরণ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইয়াসিন ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের মরিচালি গ্রামের মৃত আবদুস সাত্তার শেখের ছেলে। তিনি রাজধানী ঢাকার একটি কলেযে ডিগ্রি পাস কোর্সে পড়াশোনা করতেন। স্থানীয়ভাবে ছাত্রদলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ইয়াসিন জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন। ৭ জুলাই কলেজের ক্লাস বর্জন করে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচিতে অংশ নেন। এরপর প্রতিটি কর্মসূচিতেই তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ইয়াসিনের বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে সেনাবাহিনীতে চাকরি করবেন। বাবার স্বপ্ন পূরণে বেশ কয়েকবার সেনাবাহিনীতে ভর্তি চেষ্টা করে ব্যর্থ হন তিনি। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার একটি কোম্পানিতে চাকরি করতে দেশ ত্যাগ করেন ইয়াসিন। সেখানে কায়েক মাস চাকরির পর গত বছরের ২২ ডিসেম্বর চুক্তিভিত্তিক যোদ্ধা হিসেবে যোগ দেন রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে। রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ছবি ও ভিডিও ইয়াসিন নিজের ফেসবুকে প্রকাশ করতেন। গত ২৭ মার্চ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ হারান ইয়াসিন। ১ এপ্রিল রাশিয়ায় থাকা পরিচিতজনদের মাধ্যমে ইয়াসিনে মৃত্যুর খবর পায় তার পরিবার।

ইয়াসিনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল তাদের বাড়িতে গিয়ে সার্বিক খোঁজ-খবর নেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে আর্থিক অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি একটি ঘরর উপহার দেওয়ারও আশ্বাস দেন তারা।

ইয়াসিনের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ছেলের শোকে পাগলপ্রায় মা ফিরোজা বেগম। সারাক্ষণ ইয়াসিনের ছবি বুকে নিয়ে কান্নাকাটি করেন। শয্যাশায়ী মায়ের কণ্ঠে একটাই আকুতি- ছেলের লাশ যেন দেশে ফেরত আসে। ছেলের লাশটা তিনি দেশের মাটিতে দাফন করতে চান।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফিরোজা বেগম বলেন, আমার ছেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করেছে। স্বৈরাচার পতনের পর সে রাশিয়া যায় কোম্পানিতে চাকরি করতে। সেখানে কয়েক মাস চাকরির পর রাশিয়ান সেনবাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক যোদ্ধা হিসেবে যোগদান করে যুদ্ধে প্রাণ হারায়।

ইয়াসিনের বড় ভাই রুহুল আমিন শেখ ভাই হারানোর শোকে নির্বাক হয়ে গেছেন। একদিকে ছোট ভাই হারানোর শোক, অন্যদিকে ভাইয়ের বিদেশগমনের ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন এই চিন্তায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি। ভাইয়ের লাশ দেশে ফেরত আনা ও ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির জন্য সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর জমি বিক্রি ও ধার দেনা করে ১৫ লাখ টাকা খরচ করে ভাইকে বিদেশে পাঠাই। এরমধ্যে মাত্র দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। পাওনাদাররা টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দিচ্ছে। কীভাবে ঋণ পরিশোধ করব ভেবে পাচ্ছি না। যেহেতু সে বিদেশে মৃত্যু বরণ করেছে, তাই ভাইয়ের লাশ ও ক্ষতিপূরণ যেন পাই এটাই সরকারের কাছে দাবি।

ময়মনসিংহ উত্তর জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন পাপ্পু বলেন, ছাত্রদলের কর্মী ইয়াসিন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলেনের একজন সক্রিয় সৈনিক ছিলেন। স্বৈরাচার পতনের পর ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় রাশিয়া পাড়ি জমান। সেখানে যুদ্ধে নিহত হওয়ার পর তার লাশটি এখনো সেখানেই পড়ে আছে। দেশে আসছে না এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের এই সৈনিকের লাশ দেশে আনার জন্যে সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার এম সাজ্জাদুল হাসান বলেন, রাশিয়ায় নিহত ইয়াসিনের পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নিয়েছি আমরা। ইয়াসিনের লাশ ফেরতে পেতে পরিবার লিখিত আবেদন করেছে। আমরা আবেদনটি ঊর্ধ্বতন র্কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠিয়েছি। আমাদের পক্ষ থেকে ইয়াসিনের পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular