ঢাকা  শুক্রবার, ১৭ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসারাদেশসওজের প্রধান প্রকৌশলী মনিরুজ্জামানের অবৈধ সম্পদের পাহাড়

সওজের প্রধান প্রকৌশলী মনিরুজ্জামানের অবৈধ সম্পদের পাহাড়

# দুদকে শত কোটি টাকার লিখিত সম্পদের অভিযোগ
# কক্সবাজারে ১৫০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
# নিম্নমানের কাজ ও পুনঃসংস্কারের চক্র
# কমিশন ছাড়া ফাইল নড়ে না-ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ
# বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ, সওজের ভেতরে অসন্তোষ

নিজস্ব প্রতিবেদক : সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, টেন্ডার জালিয়াতি, কমিশন বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন দপ্তরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে সওজের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঠামোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মনিরুজ্জামান কক্সবাজার, মুন্সিগঞ্জ, রংপুর ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকালে প্রভাবশালী অবস্থান গড়ে তোলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে উপস্থাপন করে প্রশাসনিক প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে সওজের জনবল নিয়ন্ত্রণ ও বদলি-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখায় তাঁর অদৃশ্য প্রভাব বজায় রয়েছে বলে একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুবিধাজনক পোস্টিং ও বদলির ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে। সওজের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখা সাধারণত রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। মনিরুজ্জামানের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কারণেই তিনি দীর্ঘদিন এই প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হন বলে তাঁদের দাবি। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট নথি ও অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, কক্সবাজার সড়ক বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত প্রাক্কলন দেখিয়ে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়। সেখানে সমুদ্র উপকূলীয় ও পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বরাদ্দ পাওয়া প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভুয়া বিল-ভাউচার ও অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো ছিল নিয়মিত চর্চা। পরবর্তীতে রাজশাহী জোনে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ আরও জোরালো হয়ে ওঠে। রাজশাহীতে দায়িত্ব পালনকালে ৪ থেকে ৫ জন প্রভাবশালী ঠিকাদারকে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, নির্ধারিত কমিশন বা ‘পার্সেন্টেজ’ নিশ্চিত না করলে কোনো ঠিকাদারের পক্ষে টেন্ডারে অংশ নেওয়া কিংবা কাজ পাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নির্দিষ্ট কয়েকটি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ আর্থিক সম্পর্কের তথ্য দুদকে জমা পড়া অভিযোগেও উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে “আমিনুল ইসলাম কনস্ট্রাকশন” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কথাও উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) লঙ্ঘন করে দরপত্রের শর্ত এমনভাবে তৈরি করা হতো, যাতে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট ছাড়া অন্য কেউ প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারে। মুন্সিগঞ্জ সড়ক বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে সড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে নিম্নমানের কাজের অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত বা সংস্কার করা সড়ক বর্ষা শুরুর আগেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, কমিশনভিত্তিক প্রকল্প অনুমোদনের সংস্কৃতি সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অন্যতম কারণ। ফলে এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক পুনরায় সংস্কারের তালিকায় চলে আসে। তবে সওজের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন উইংয়ের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, বিভিন্ন প্রকল্পের প্রশাসনিক ও কারিগরি অনুমোদনের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন ছাড়া কোনো ফাইল অনুমোদন হতো না।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঠিকাদারদের কাছ থেকে অগ্রিম কমিশন নেওয়ার কারণে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার হলেও চূড়ান্ত বিল অনুমোদনে বাধা থাকত না। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় সড়ক খাতের উন্নয়ন প্রকল্পে গড়ে ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেট কাজ করছে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোনো কর্মকর্তার পক্ষে এত দীর্ঘ সময় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও টেন্ডার জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ফরিদপুরে আদি বাড়ি থাকা মনিরুজ্জামান গত এক দশকে ঢাকা, ফরিদপুর ও রাজশাহীতে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ফরিদপুরে কৃষি ও অকৃষি জমি, রাজশাহীতে বাণিজ্যিক প্লট ও ফ্ল্যাট, এবং ঢাকার বনানী, গুলশান, বসুন্ধরা ও নিকেতন এলাকায় তাঁর ও আত্মীয়স্বজনদের নামে একাধিক মূল্যবান সম্পত্তি রয়েছে। এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিপুল অঙ্কের এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রের তথ্যও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। একজন সরকারি গ্রেড-২ বা গ্রেড-৩ কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে এই সম্পদের অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে অভিযোগ করা হয়েছে, হুন্ডির মাধ্যমে তাঁর বিপুল পরিমাণ অর্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও দুবাইয়ে পাচার করা হয়েছে। দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, তাঁর ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির দলিল ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও সূত্রটি দাবি করেছে। দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে টেন্ডার বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ কমিশনে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই শেষে নিয়ম অনুযায়ী অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সওজের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা নিজস্ব সিন্ডিকেট ও অবৈধ অর্থের জোরে পুরো প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করছেন। এতে সৎ কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। তিনি বলেন, ই-জিপি ব্যবস্থায় কারিগরি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে অনেক ঠিকাদারকে প্রতিযোগিতা থেকে বাইরে রাখা হচ্ছে।

এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. মনিরুজ্জামানের দপ্তরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি বা অবৈধ সম্পদের অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সরকার শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করবে। তিনি বলেন, দুদক বা অন্য কোনো তদন্ত সংস্থা তথ্য চাইলে মন্ত্রণালয় পূর্ণ সহযোগিতা করবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular