ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeশিক্ষাহুয়ালাই: লাফিয়ে নদী পার হওয়ার গল্পটা সত্যি

হুয়ালাই: লাফিয়ে নদী পার হওয়ার গল্পটা সত্যি

সৈয়দা নার্গিস

হুয়ালাই আকারে ক্ষুদ্র হলেও ইতিহাস, প্রকৃতি ও বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্যে নদীটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। হুয়ালাই চীনের এমন এক নদী, যার বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য তার ক্ষুদ্রতা। নদীটি এতটাই সরু যে, এক লাফেই পার হওয়া সম্ভব।

পৃথিবীর নদী বলতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল জলরাশি, প্রশস্ত বুক আর দুরন্ত স্রোতের ছবি। বাংলাদেশের পদ্মা কিংবা ব্রহ্মপুত্রের মতো নদীগুলো তাদের বিশালতার জন্য পরিচিত।

চীনের ইনার মঙ্গোলিয়া অঞ্চলের তৃণভূমিতে বয়ে চলা হুয়ালাই নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭ কিলোমিটার। অথচ এর গড় প্রস্থ মাত্র ১৫ সেন্টিমিটার। কোনো কোনো জায়গায় তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৪ সেন্টিমিটারে। নদীটির গভীরতা প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এত সরু জলধারাকে প্রথম দেখায় সাধারণ নালা কিংবা ছোট কোনো ঝর্ণা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু নদীটির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য একে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।

আকারে ছোট, বৈশিষ্ট্যে অনন্য

সাধারণত নদীর বিশালতা নির্ধারিত হয় তার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ কিংবা পানির প্রবাহের পরিমাণ দিয়ে। হুয়ালাই নদী সেই প্রচলিত ধারণায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে নদীর পরিচয় কেবল তার আকারের ওপর নির্ভর করে না; বরং পানির ধারাবাহিক প্রবাহ, নিজস্ব উপত্যকা এবং প্লাবনভূমির মতো বৈশিষ্ট্যও গুরুত্বপূর্ণ। হুয়ালাই নদীর ক্ষেত্রেও এসব বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি একে সাধারণ জলধারা থেকে আলাদা করেছে।

ধারণা করা হয়, নদীটির উৎপত্তি একটি ভূগর্ভস্থ প্রস্রবণ থেকে। সেখান থেকে প্রবাহিত হয়ে এটি হেক্সিফটেন গ্রাসল্যান্ড নেচার রিজার্ভের দালাই নুর হ্রদে গিয়ে মিশেছে। নদীটির উৎপত্তি ও দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকার ইতিহাস প্রকৃতিপ্রেমী এবং গবেষকদের কাছে আগ্রহের বিষয়। স্থানীয়ভাবে এটি হাজার হাজার বছরের পুরোনো জলধারা হিসেবে পরিচিত। ধারণা করা হয় প্রায় ১০ হাজার বছর ধরে এটি প্রবহমান।

বইয়ের সেতু, পিঁপড়ার পথ

হুয়ালাই নদীর আরেকটি আকর্ষণীয় পরিচিতি হলো ‘বুক ব্রিজ রিভার’ বা ‘বই সেতুর নদী’। এ নামের পেছনে প্রচলিত রয়েছে একটি মজার লোককথা। কথিত আছে, এক শিশু নদী পার হওয়ার সময় ভুল করে তার বইটি নদীর সবচেয়ে সরু অংশে ফেলে দেয়। বইটি দুই তীরের মধ্যে এমনভাবে আটকে যায়, যেন তৈরি হয় ছোট্ট একটি সেতু। পরে একদল পিঁপড়া সেই বইয়ের ওপর দিয়ে নদী পার হয়। এই গল্প থেকেই নদীটির এমন নামের প্রচলন হয়েছে বলে মনে করা হয়।

প্রকৃতির ক্ষুদ্র বিস্ময়

হুয়ালাই নদী শুধু দর্শনার্থীদের বিস্মিত করে না, স্থানীয় পরিবেশেও ভূমিকা রাখে। এর পানি কৃষিকাজের সেচে ব্যবহৃত হয় বলে জানা যায়। পাশাপাশি বন্য প্রাণী ও গৃহপালিত পশুর পানির চাহিদা মেটাতেও জলধারাটি সহায়ক। স্বচ্ছ পানির সরু প্রবাহ, তৃণভূমির পরিবেশ এবং নদীটির ব্যতিক্রমী গঠন একে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

পৃথিবীর কোনো নদী তার বিশালতার জন্য পরিচিত, কোনোটি আবার গভীরতা কিংবা স্রোতের তীব্রতার জন্য। হুয়ালাই নদী যেন সেই পরিচিত ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। তার বুক এতটাই সরু যে, এক পা বাড়িয়েই পার হওয়া যায়, অথচ প্রকৃতির বুকে সে বহন করে চলেছে দীর্ঘ ইতিহাস ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। হুয়ালাই তাই শুধু একটি নদী নয়, প্রকৃতির বিস্ময়কর বৈচিত্র্যের এক অনন্য উদাহরণ।

লেখক- শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

আরো খবর
Continue to the category
- Advertisment -spot_img

Most Popular