ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
HomeUncategorized৬ লেন হচ্ছে ঢাকা-গাজীপুর মহাসড়ক

৬ লেন হচ্ছে ঢাকা-গাজীপুর মহাসড়ক

অর্থনীতি ডেস্ক: দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে ঝুলিয়ে রাখা এবং ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয়ের পর অবশেষে বাতিল করা হয়েছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বহুল আলোচিত ঢাকা-গাজীপুর বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প।

বিশেষ বাস চালানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত চালু করতে না পেরে পুরো অবকাঠামোকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিআরটি করিডরের নির্মিত স্টেশন ও লেন বিভাজক ভেঙে ফেলে সড়কটিকে তিন থেকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে উন্নীত করা হবে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে গাজীপুরের বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিষদ আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে জারি করা এক পত্রে সভার বিস্তারিত সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।

প্রকল্পের নতুন রূপ ও নির্দেশনাবলী

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথের স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করে তিন থেকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের পাশাপাশি সেখানকার দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ককে চার লেনে উন্নীত করা হবে। এছাড়া বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত ‘ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি’ বন্ধ করে এর সমস্ত কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় নেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেছে মন্ত্রিসভা।

সংশ্লিষ্ট উন্নয়নসহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আইনি জটিলতা নিরসন এবং প্রকল্প বন্ধের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া জরুরি ভিত্তিতে শেষ করতে বলা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি ১৫ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে এবং কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।

উল্লেখ্য, সভার আলোচনায় চারটি বিকল্প ছিল- প্রকল্প বাতিল, অসমাপ্ত কাজ শেষ করে বাস চালানো, বিশেষ ও সাধারণ বাসের যৌথ চলাচল এবং টোলের আওতায় পরিচালনা। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার প্রথম বিকল্প অর্থাৎ প্রকল্প বাতিল করে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বিশেষজ্ঞ মতামত ও ব্যাকগ্রাউন্ড

প্রকল্পটির কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হকের নেতৃত্বাধীন এক বিশেষজ্ঞ দল এটিকে পুরোপুরি বাতিল করে উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করে। তাদের প্রতিবেদনে প্রকল্পটিকে দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতার’ উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

যথাযথ কারিগরি সমীক্ষার অভাব, নকশাগত ত্রুটি, বাসের ডানদিকে দরজার জটিলতা এবং আন্ত-সংস্থা সমন্বয়হীনতাকে এর প্রধান কারণ বলা হয়েছে। অধ্যাপক সামছুল হক জানান, এটি বাতিল করে উচ্চগতির মহাসড়কে রূপান্তর করা এবং কমলাপুর পর্যন্ত কমিউটার ট্রেন চালু করাই গাজীপুরবাসীর জন্য সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হবে।

অন্যদিকে, প্রকল্পের ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ায় এটি বাতিলের প্রতিবাদ জানিয়েছে ‘গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন’ নামক একটি স্থানীয় সংগঠন। সংগঠনের সভাপতি মো. শামসুল হক জানান, ১৪ বছর দুর্ভোগ পোহানোর পর শেষ মুহূর্তে এসে প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে তারা সরকারকে চিঠি দেবেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-ও পূর্বের এক সেমিনারে সতর্ক করেছিল যে, নির্মিত অবকাঠামো ভাঙতে ও ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে সরকারের অতিরিক্ত এক হাজার কোটি টাকার বেশি অপচয় হতে পারে।

শুরু থেকে অপচয় ও দুর্ভোগের চিত্র

২০১২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা প্রাথমিক বাজেটে এই প্রকল্প হাতে নিয়েছিল, যা তিন দফায় সংশোধিত হয়ে ব্যয় দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায়।

সর্বশেষ ২০২৫ সালে চতুর্থবার সংশোধন করে ব্যয় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একনেক তা বাতিল করে দেয়।

পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা ছাড়া শুরু করা এই প্রকল্পের অধীনে সড়কের মাঝখানে নির্মাণ করা ১৫টি স্টেশনের কোনোটির কাজই সম্পূর্ণ হয়নি। ক্রেন দুর্ঘটনাসহ একাধিক দুর্ঘটনায় মোট সাতজনের প্রাণহানি ঘটেছে এই পথে।

নির্মাণসামগ্রী ও বিভাজকের কারণে সরু হয়ে যাওয়া সড়কে বিগত ১৪ বছর ধরে চরম যানজট ও অবর্ণনীয় ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে সাধারণ মানুষ ও যানবাহন চালকদের। বিশ্বব্যাপী ১৯১টি শহরে সফলভাবে বিআরটি পরিচালিত হলেও বাংলাদেশে সঠিক পরিকল্পনা ও দক্ষতার অভাবে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পর শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেল এই উদ্যোগ।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular