নিশুতি এক্সপ্রেস – ডা. ইকবাল আহমেদ
রাতের ট্রেন যখন চেনা শহরের সীমান ছেড়ে যায়
কোথায় যেন বিচ্ছেদের আবহ সংগীত বাজে।
প্ল্যাটফর্মের কোলাহল,
চায়ের দোকানের হাক ডাক,
বিদায়ের হাত নাড়ানো মুখগুলো
ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে অন্ধকারে।
ট্রেন গতি পেলে
শহরের আলোও আর সঙ্গ দেয় না,
শুধু জানালার কাঁচে লেগে থাকে
কিছু বিচ্ছিন্ন আলোর স্মৃতি।
কখনো দূরের গাছের সারি
পালিয়ে যাওয়া ছায়ার মতো দৌড়ায় সমান্তরালে।
তারপর একসময়
ট্রেনের ছন্দ আর হৃদস্পন্দন
একই তালে মিশে যায়।
বগির ভেতরে সবাই স্বাভাবিক।
কেউ গল্প করছে,
কেউ মোবাইলের পর্দায় ডুবে আছে,
কেউ চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে নিশ্চুপ।
তবু প্রত্যেকের ভেতরে
একটি ক্ষুদ্র প্রহরী জেগে থাকে।
সুটকেসের হাতল,
কাঁধের ব্যাগ,
শার্টের বুকপকেট,
মোবাইল ফোনের অবস্থান—
সবকিছুর খবর রাখে সে।
দূরের স্টেশনগুলো আসে
হলুদ আলো হাতে নিয়ে,
কয়েক মুহূর্ত থেমে থাকে,
তারপর আবার হারিয়ে যায়
রাতের বিশাল কালো সমারোহে।
জানালার বাইরে
গাছেরা ছায়া হয়ে দৌড়ায়,
নামহীন গ্রামগুলো
ঘুমন্ত পাখির মত জড়োসড়ো বসে থাকে মাঠের পাশে।
কোথাও কোনো বিপদের চিহ্ন নেই,
তবু একেবারে নির্ভার হওয়াও যায় না।
মনে হয়,
এই অন্ধকারেরও নিশ্চয় নিজস্ব ইতিহাস আছে,
নিজস্ব কিছু গোপন সংবাদ,
যা দিনের আলোরা কখনো জানতে পারেনা।
কখনো জানালায় নিজের মুখ ভেসে ওঠে,
মনে হয় অপরিচিত কোনো যাত্রী
চুপচাপ তাকিয়ে আছে।
কখনো দূরের একটিমাত্র আলো
এত একা দেখায়,
যেন পৃথিবীর শেষ জেগে থাকা মানুষটির ঘর।
কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে বসেও আরেকটু জায়গা
দখলের জখলের জন্য নীরবে এমনভাবে লড়ে যায়
যেন বিরোধপুর্ণ ভুমির দুই প্রতিবেশী।
অন্যদিকে এলিট কামড়ায়
আর্মরেস্ট বিভক্ত করে দেয়
একই ভাগ্যের দুরত্ব।
রাত যত গভীর হয়,
কথাবার্তা তত কমে আসে,
আর ট্রেনের ধাতব ছন্দ
ধীরে ধীরে ঢুকে যায় ভাবনার ভেতর।
তখন বুঝি—
এ ভয় নয়,
এ অস্থিরতাও নয়।
এ যেন অজানার প্রতি মানুষের
সহস্র বছরের পুরোনো সতর্কতা;
যেন নিজের গন্তব্য,
নিজের ঘুম,
নিজের ক্ষুদ্র নিরাপত্তা
রাতের হাতে সমর্পণ করে
নীরবে এগিয়ে যাওয়ার অনুভূতি।
চাকার হঠাৎ ক্যাচ ক্যাচ ধাতব আর্তনাদ যেন
রাতের নীরবতার সাথে এক অদ্রবনীয় মিশ্রণ,
এভাবেই ট্রেন ছুটে চলে ,
অন্ধাকারের মহাকাল বিদীর্ণ করে
দূরের কোনো ভোরের দিকে—
যেখানে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত
প্রত্যেক ঘুমন্ত যাত্রী
নিজের ভেতরে একটু করে জেগেই থাকে।
——– ——– ——–




