ঢাকা  বুধবার, ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসারাদেশনোয়াখালীসংকটে আছে ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলটি

সংকটে আছে ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলটি

সৈয়দা শিরীন, বিশেষ প্রতিবেদক: বছরের হিসেবে ১৭৬ বছর কম নয়। এই ১৭৬ বছরে তিনবার নদীভাঙন ও দুইবার ঘূর্ণিঝড়ে সম্পূর্ণ বিলীন হয়েও বার বার ঘুরে দাঁড়িয়ে মেধার বাতি জ্বালিয়ে টিকে আছে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান নোয়াখালী জিলা স্কুল।

মেধা বিকাশের গৌরবময় ইতিহাসের সেই প্রতিষ্ঠান আজ অস্তিত্ব সংকটে। শিক্ষার পরিবেশ ৮০ শতাংশই ধ্বংসপ্রাপ্ত, টিকে আছে মাত্র ২০ শতাংশ।

গৌরবোজ্জ্বল অতীত 

১৮৫০ সালে ইংরেজ সরকার ভারতীয় উপমহাদেশের ১৭টি জেলায় একটি করে জিলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। তার মধ্যে বাংলাদেশে জিলা স্কুল ছিল ১৪টি, পশ্চিমবঙ্গে ছিল ৩টি। তন্মধ্যে মাত্র ৭.৩৮ একরের ওপর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের একটি নোয়াখালী জিলা স্কুল।

এ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় আয়ারল্যান্ডের ইংরেজ কর্মকর্তা মি. জোনসের সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল।

বারংবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে

ইতিহাস থেকে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার পর ১৯২০ সালে এ স্কুল নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, ফলে ১৯২১ সালে মহব্বতপুর গ্রামের পূর্ব প্রান্তে মন্তিয়ার ঘোনায় স্থানান্তরিত হয় স্কুলটি। বিদ্যালয়টি আবারো নদীভাঙনের শিকার হলে ১৯২৩ সালের ১ জানুয়ারি আর. কে. জুবিলী বিদ্যালয়ে একে স্থানান্তর করা হয় ও স্কুলের নামকরণ করা হয় আর. কে. জিলা স্কুল। ১৯৩১ সালে স্কুলটি আবার নদীভাঙনের কবলে পড়ে, ফলে বিদ্যালয়কে আহম্মদিয়া মাদরাসায় স্থানান্তর করা হয়। সেখানে এর প্রভাতি শাখা চালু হয়।

বিদ্যালয়টি আবারো নদীভাঙনের কবলে পড়লে বঙ্গ বিদ্যালয়ে ও ১৯৪৮ সালে তা বঙ্গবিদ্যালয় থেকে কারামতিয়া মাদরাসায় আনা হয়। ১৯৫৩ সালে কারামতিয়া মাদরাসা থেকে এটি বর্তমান মাইজদী সদরে প্রধান সড়কের পাশে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫৮ ও ১৯৭০ সালে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বিদ্যালয়টি সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়, পরে একে পুনর্নির্মাণ করা হয়।

 

বিখ্যাতদের স্মৃতিবিজড়িত জিলা স্কুল

এ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্ররা প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পেশায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন। এরমধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক, প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মূসা, সাবেক সচিব প্রয়াত সা’দত হোসেন, সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত এএইচ মোফাজ্জল করিম, প্রয়াত শহীদউদ্দীন এস্কান্দার কচি (খেলোয়াড় ও রাজনীতিবিদ), মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান যিনি তিন মেয়াদে ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত এবং বঙ্গে এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজাফফর আহমদ, প্রকৌশলী ফজলুর করিম, প্রয়াত আব্দুর রশিদ (এম.পি), এমাদ উদ্দীন, জামাল উদ্দীন, কর্নেল (অব.) সালাউদ্দীন, ডা. বাহার, প্রফেসর গাজী আহসানুল কবির এবং ওয়েডিং ডায়েরির স্বত্বাধিকারী প্রীত রেজা, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার এবং সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এ কে এম ফজলুল কাদের চৌধুরী, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জসিম উদ্দিনসহ আরও অনেকে।

মহান মুক্তিযুদ্ধেও ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ পাওয়ার ক্ষেত্রে এ স্কুলের ছাত্রদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তৎকালীন জিলা স্কুলের অসংখ্য শিক্ষার্থী অংশ নেন স্বাধীনতা যুদ্ধে। তাদেরই কয়েকজন ড. শাহাদাত হোসেন সিএসপি, মিজানুর রহমান, মাহমুদুর রহমান বেলায়েত (বিএলএফ কমান্ডার), এ.কে আযাদ (আযাদ কমিশনার), একরামুল হক, অহিদুর রহমান, জসিম উদ্দীন, ক্যাশ সরকার, বিশ্বেশ্বর দে সহ কয়েকজন শাহাদাত বরণ করেন।

ধুঁকছে মেধার বাতিঘর

সরেজমিনে নোয়াখালী জিলা স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, কম্পিউটার ল্যাব, বিজ্ঞানাগার, লাইব্রেরি, আবাসিক হোস্টেলসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কক্ষ পরিত্যক্ত এবং কার্যক্রম না থাকায় কয়েক ইঞ্চি ধুলাবালি জমে নষ্ট হচ্ছে দামি যন্ত্রপাতি। একাডেমিক ভবনগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং শিক্ষক-কর্মচারী সংকটও চরমে।

জানা গেছে, নোয়াখালী জিলা স্কুলে বর্তমানে এক হাজার ২৭০ জন ছাত্র অধ্যয়নরত। এরমধ্যে প্রভাতি শাখায় ৬৫২ ও দিবা শাখায় ৬১৮ জন। শিক্ষকের ৫৩ পদের মধ্যে প্রধান শিক্ষকসহ ১৪ জনের পদ খালি এবং ১০ জন কর্মচারীর পদও শূন্য। তবে বিদ্যালয়টিতে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার শতকরা ৯৮.৮৮ শতাংশ এবং ওই বছর জুনিয়র বৃত্তি পেয়েছে ৫১ জন ছাত্র।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কাশেম  বলেন, জেলার ঐতিহ্যবাহী এ বিদ্যালয়ে অবকাঠামো নেই বললেই চলে। শিক্ষার পরিবেশ ৮০ শতাংশই বিলুপ্ত। বাকি মাত্র ২০ শতাংশ দিয়ে কীভাবে মান ধরে রাখা যায় তা জানি না। এখানে পর্যাপ্ত একাডেমিক ভবন, প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও আনুষঙ্গিক সমস্যার সমাধান না হলে শিক্ষার পরিবেশ অচিরেই বিলুপ্ত হবে।

বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ স্যাঁতসেঁতে ভবনে বিজ্ঞানাগার ও কম্পিউটার ল্যাব পড়ে আছে। ভবনের বাইরে ঘাস জমেছে বুক পরিমাণ আর ভেতরে ধুলাবালির স্তূপে নষ্ট হচ্ছে দামি যন্ত্রপাতি। মূল ভবনের তৃতীয় তলায় লাইব্রেরিরও একই অবস্থা। প্রায় ১৩০০ ছাত্রের জন্য মাত্র দুটি শৌচাগার চালু আছে, সেখানেও নোংরা পরিবেশ। বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে ফাটল ধরে বৃষ্টির পানি পড়ছে। ছাত্রের অভাবে আবাসিকও দীর্ঘদিন বন্ধ। প্রতি কক্ষে ৫৫-৬০ জন করে ছাত্র ক্লাস করছে।

ছাত্র-শিক্ষকদের ক্ষোভ

সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. শাহ আলম বলেন, শিক্ষক নেই, কর্মচারি নেই, ভবন নেই, সীমানা প্রাচীর নেই, ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় টয়লেটও নেই। নেই-নেই, কিছুই নেই। তাহলে এখানে শিক্ষার পরিবেশ থাকবে কীভাবে। সরকার যদি তড়িৎভাবে এসবের সমাধান না করে তাহলে এখানে শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।

আরেক সহকারী প্রধান শিক্ষক নুরুল আমিন বলেন, নতুন ভবন করার কথা বলে আমাদের একটি ভবন ভেঙে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই স্থানে আর কোনো ভবন এখনো হয়নি। অবকাঠামোর অভাবে বিদ্যালয়টি তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে সকল কার্যক্রম। বার বার পত্র দিয়েও কোনোভাবে শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।

আবদুর রহমান নামে নবম শ্রেণির এক ছাত্র জাগো নিউজকে বলেন, স্যাররা অতিরিক্ত ক্লাস নিতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠেন। ৪০ মিনিটের ক্লাসে শিক্ষকের আসা-যাওয়ায় ২০-২৫ মিনিটের বেশি সময় থাকে না। আমাদের বিদ্যালয়ের সামনের চাকচিক্যময় একটা গেট ছাড়া কিছুই নেই। বাইরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট অবস্থা।

নোয়াখালী ভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নোয়াখালী রুরাল ডেভলপমেন্ট সোসাইটির (এনআরডিএস) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আবদুল আউয়াল জাগো নিউজকে বলেন, ১৯৬৫ থেকে ৭০ সাল পর্যন্ত আমার এ বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয়েছে। তখন টিনশেড ঘরে বিদ্যালয়ে পড়ার যে মান ছিল তা এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। পুরোনো বন্ধুরা দেশ-বিদেশে নানা পেশায় অবদান রাখছে। প্রতিযোগিতার বাজারে এখন ভঙ্গুর এ শিক্ষা ব্যবস্থা কোনো কাজে আসবে বলে মনে হয় না।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular