ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসারাদেশহাম কেড়ে নিল ১১ মাসের মালিহাকে, শোকে স্তব্ধ পরিবার

হাম কেড়ে নিল ১১ মাসের মালিহাকে, শোকে স্তব্ধ পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঘরের এক কোণে এখনও পড়ে আছে ছোট্ট গোলাপি জামাটি। বিছানার পাশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা খেলনাগুলো যেন অপেক্ষা করছে তাদের ছোট্ট সঙ্গীর জন্য। মাঝে মাঝে সেগুলো হাতে নিয়ে নির্বাক বসে থাকেন মা। মনে হয়, এই বুঝি হামাগুড়ি দিয়ে এসে কোলে উঠবে তাঁর আদরের মেয়ে। কিন্তু সে আর ফিরবে না। হামে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ১১ মাস ১৭ দিনের জীবনে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছে মালিহা বিনতে মাহফুজ।

গত রোজার ঈদে বাবা-মায়ের সঙ্গে সাভারের আশুলিয়া থেকে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার বাঙ্গালা ইউনিয়নের ভয়ানগর গ্রামে দাদার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল মালিহা। পরিবারের সবার আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু ছিল শিশুটি। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। হঠাৎ জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে চিকিৎসকেরা জানান, সে হামের উপসর্গে আক্রান্ত।

প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করিয়ে ঢাকায় ফিরে আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয় মালিহাকে। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে ভর্তি করা হয় রাজধানীর মিরপুর-২ এলাকার এম আর খান শিশু হাসপাতালে। সেখানে কয়েক দিন চিকিৎসার পরও জ্বর না কমায় তাকে হাম ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। কিছুটা সুস্থ হলে বাড়িতে নেওয়া হলেও কয়েক দিনের মধ্যে আবার জ্বর আসে। পরে ফের হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে।

অবস্থা আরও গুরুতর হলে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয় মালিহাকে। সেখানে অক্সিজেন ও পিআইসিইউ সাপোর্টে চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে গত ১২ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সে।

মালিহার বাবা মাহফুজুর রহমান গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। পরিবার নিয়ে আশুলিয়ায় থাকতেন তিনি। দুই মেয়েকে নিয়ে ছিল তাদের ছোট্ট সংসার। বড় মেয়ে মুসকানের বয়স চার বছর। ছোট বোনকে হারিয়ে সে এখনও মাকে প্রশ্ন করে, “মালিহা কবে বাসায় আসবে?”

এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না কেউ।

কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন মালিহার দাদা আব্দুস সালাম। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, “ঈদ করতে এসেছিল ওরা। কে জানত, এটাই হবে নাতনির শেষ আসা। উল্লাপাড়া থেকে ঢাকা—সব জায়গায় চিকিৎসা করিয়েছি। কিন্তু আল্লাহ তাকে আর রাখলেন না। এখন ঘরে ঢুকলেই শুধু শূন্যতা লাগে।”

তিনি আরও বলেন, “ভয়ানগরে এসে হামে আক্রান্ত হলো, আবার সেই ভয়ানগরের মাটিতেই তাকে কবর দিতে হলো। এই কষ্ট কোনো দিন ভুলতে পারব না।”

স্বজনেরা জানান, হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময় মাঝেমধ্যে মালিহা চোখ মেলে মায়ের দিকে তাকাত। সেই দৃষ্টি এখনও তাড়া করে ফেরে তার মাকে। শিশুটির মৃত্যুর পর থেকে পরিবারের কেউ স্বাভাবিক হতে পারেননি।

হামের টিকা না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আক্ষেপ করেছেন মালিহার বাবা মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, “দুই মাস আগে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালে আমি ও আমার স্ত্রী দুবার গিয়েও হামের টিকা দিতে পারিনি। তখন টিকা না থাকায় আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে আর টিকা দেওয়া হয়নি।”

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “মালিহার মুখে সব সময় হাসি লেগে থাকত। সবার কোলে যেত, কোলে গেলেই মিষ্টি করে হাসত। সেই হাসিটা এখনও চোখের সামনে ভাসে। আমরা কেউই ওকে হারানোর কষ্ট মেনে নিতে পারছি না।”

দেয়ালে টাঙানো মেয়ের ছবির দিকে তাকালেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা-বাবা। মাহফুজ বলেন, “ওর মা সবসময় কাঁদছে। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই।”

সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. নুরুল আমিন বলেন, জেলায় হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে এক শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। শিশুটি উল্লাপাড়ার হলেও ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

ঢাকানিউজ/নাজ/24

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular