অধ্যাপক ড. মো. লোকমান হোসেন
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান অনস্বীকার্য। মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের জীবন, সম্পদ ও ভবিষ্যৎ উৎসর্গ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছেন।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থসামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন সময় নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার অন্যতম হলো বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট। ট্রাস্টটি মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারকে আর্থিক, সামাজিক ও কল্যাণমূলক সহায়তা প্রদান করে আসছে।
যুগোপযোগী করা প্রয়োজন
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা, মূল্যস্ফীতি এবং প্রজন্মান্তরের পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের কার্যক্রম আরও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন।
বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থা
সরকারি তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশে তালিকাভুক্ত জীবিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ২ লাখেরও বেশি। তাদের একটি বড় অংশের বয়স ৭০ বছরের ঊর্ধ্বে। বয়সজনিত অসুস্থতা, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের কারণে অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
বিভিন্ন সরকারি ও গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়—
সূচক আনুমানিক হার (%)
৭০ বছরের বেশি বয়সী মুক্তিযোদ্ধা ৬৫-৭০
নিয়মিত চিকিৎসা সেবার প্রয়োজন ৮০+
সরকারি ভাতা নির্ভর পরিবার ৬০+
শহরাঞ্চলে বসবাসকারী ৪৫
গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী ৫৫
নিজস্ব আবাসনের মালিক ৭০
নিম্ন-মধ্যম আয়ের পরিবার ৫০+
উপর্যুক্ত তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও আর্থিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করেন।
মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য
১৯৭২ সালে সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করে। ট্রাস্টের প্রধান উদ্দেশ্য হলো—(ক) মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক সহায়তা প্রদান। (খ) চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা নিশ্চিত করা। (৩) আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। (৪) মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সহায়তা করা। (৫) ট্রাস্টের সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কল্যাণ তহবিল বৃদ্ধি করা।
মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে সরকার
(১) মাসিক সম্মানী ভাতা: স্বাধীনতার পর প্রথমদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সীমিত ভাতা চালু থাকলেও বর্তমানে সরকার মাসিক সম্মানী ভাতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। বর্তমানে অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন, যা তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সন মাসিক ভাতা (টাকা)
২০০৯ ২,০০০
২০১৫ ১০,০০০
২০২০ ২০,০০০
২০২৪-২৫ ২০,০০০+ অন্যান্য সুবিধা
(২) চিকিৎসা সহায়তা: ট্রাস্টের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা কর্মসূচি চালু রয়েছে। এর আওতায়- (ক) সরকারি হাসপাতালে অগ্রাধিকার চিকিৎসা। (খ) জটিল রোগের জন্য আর্থিক অনুদান। (গ) বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা। (ঘ) চিকিৎসা ভাতা প্রদান। বয়সজনিত কারণে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি ও ক্যানসারজনিত সমস্যায় আক্রান্ত মুক্তিযোদ্ধারা এ সুবিধার মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন।
(৩) আবাসন কর্মসূচি: সরকার “বীর নিবাস” প্রকল্পের মাধ্যমে অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আবাসন নির্মাণ করছে। প্রকল্পের আওতায় কয়েক হাজার গৃহহীন বা জরাজীর্ণ ঘরে বসবাসকারী মুক্তিযোদ্ধা পরিবার নতুন আবাসন সুবিধা পেয়েছে।
(৪) শিক্ষা সহায়তা: মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও সন্ততির জন্য—(ক) শিক্ষাবৃত্তি। (খ) কোটা সুবিধা। (গ) বিশেষ শিক্ষা অনুদান। (ঘ) প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু রয়েছে।
(৫) ব্যবসা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা: মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট বিভিন্ন বাণিজ্যিক সম্পত্তি, বিপণিবিতান, জমি ও স্থাপনা পরিচালনা করে। এসব সম্পদ থেকে অর্জিত আয়ের একটি অংশ মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়।
(৬) এককালীন আর্থিক অনুদান: দুরারোগ্য ব্যাধি, পারিবারিক দুর্যোগ বা আর্থিক সংকটে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রাস্ট বিশেষ অনুদান প্রদান করে থাকে।
সরকারি পদক্ষেপের ইতিবাচক প্রভাব
(ক) দারিদ্র্য হ্রাস: ভাতা বৃদ্ধি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
(খ) স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন: সরকারি চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণের ফলে অনেক মুক্তিযোদ্ধা উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন।
(গ) সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি: মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, ভাতা ও বিভিন্ন সুবিধা সমাজে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে।
(ঘ) শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন: মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নতুন প্রজন্ম উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে।
বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ
যদিও সরকার উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তবুও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে।
(১) মূল্যস্ফীতির প্রভাব: বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ২০,০০০ টাকার মাসিক ভাতা অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়। বিশেষত চিকিৎসা ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
(২) স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা: গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই উন্নত চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
(৩) ট্রাস্টের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার ঘাটতি: কিছু ক্ষেত্রে ট্রাস্টের সম্পদ থেকে সম্ভাব্য আয় অর্জিত হচ্ছে না। ফলে কল্যাণমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়।
(৪) তথ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা: অনেক মুক্তিযোদ্ধার হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষণ ও সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে।
(৫) প্রজন্মভিত্তিক কল্যাণ পরিকল্পনার অভাব: মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা এখনও পর্যাপ্ত নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাস্টের করণীয়
(১) ভাতা কাঠামোর পুনর্মূল্যায়ন: মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি দুই বা তিন বছর পর ভাতার পরিমাণ পুনর্নির্ধারণ করা উচিত।
(২) বিশেষায়িত স্বাস্থ্যবিমা চালু: মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যবিমা চালু করা যেতে পারে, যাতে ব্যয়বহুল চিকিৎসার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমে।
(৩) ডিজিটাল সেবা প্ল্যাটফর্ম: একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেইস গড়ে তুলে—
(ক) ভাতা প্রদান, (ক) চিকিৎসা সহায়তা, (গ) অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, (ঘ) তথ্য হালনাগাদ অনলাইনে পরিচালনা করা যেতে পারে।
(৪) ট্রাস্টের সম্পদের আধুনিক ব্যবস্থাপনা: অব্যবহৃত জমি ও স্থাপনাকে বাণিজ্যিকভাবে উন্নয়ন করে ট্রাস্টের আয় বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
(৫) মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কর্মসংস্থান: সন্তান-সন্ততিদের জন্য—(ক) দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, (খ) স্টার্টআপ সহায়তা, (গ) ক্ষুদ্রঋণ, (গ) উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে।
(৬) জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র: প্রত্যেক বিভাগ বা জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা ইউনিট স্থাপন করা প্রয়োজন।
(৭) গবেষণা ও নীতিনির্ধারণ ইউনিট গঠন: মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়মিত মূল্যায়নের জন্য ট্রাস্টের অধীনে একটি গবেষণা সেল প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জনের ভিত্তি। তাঁদের আর্থসামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার ও মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গত কয়েক দশকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মাসিক ভাতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা সহায়তা, আবাসন কর্মসূচি, শিক্ষা সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। তবে মূল্যস্ফীতি, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বার্ধক্যজনিত সমস্যার কারণে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। তাই ট্রাস্টের সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যবিমা চালু এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
লেখক- সাবেক মহা-পরিচালক, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম)
শিক্ষা মন্ত্রণালয়।




