ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeঅর্থনীতিজাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি

জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি

মাহমুদ মীর
বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হলেও দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বাণিজ্য ঘাটতি
বর্তমানে উভয় দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩.৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এই বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৭০০ মিলিয়ন (৭০ কোটি) ডলার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পণ্যের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্য বাড়াতে ও ঘাটতি কমাতে বড় ভরসা হয়ে উঠেছে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন টোকিও সফর।

বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত

জাপানের টোকিওভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিক্কেই-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জাপানের বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশে ৬.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে জাপান।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এই বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। এই বিনিয়োগ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে সম্পূর্ণ নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঐতিহাসিক ইপিএ চুক্তি ও তার প্রভাব
বাণিজ্য বাড়াতে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ইপিএ (বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিশেষ) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো দেশের সঙ্গে প্রথম ইপিএ চুক্তি।
এই চুক্তিটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও কার্যকর করা হলে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তোলার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
সুবিধা ও চ্যালেঞ্জসমূহ:
    • শুল্কমুক্ত সুবিধা: ইপিএ চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের ৭,৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। বিপরীতে, জাপানের ১,০৩৯টি পণ্য বাংলাদেশে একই সুবিধা পাবে।
    • পোশাক খাতে বিশেষ ছাড়: বর্তমানে জাপানি বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে জটিল ‘ট্রান্সফরমেশন রুলস অব অরিজিন’ অনুসরণ করতে হয়। চুক্তি কার্যকর হলে এটি শিথিল হয়ে ‘সিঙ্গেল-স্টেজ ট্রান্সফরমেশন রুলস অব অরিজিন’ হবে। অর্থাৎ, বাংলাদেশে যেকোনো একটি উৎপাদনের ধাপ সম্পন্ন হলেই সেই পোশাক জাপানে রপ্তানি করা যাবে।
    • রাজস্ব ক্ষতি: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তি বাস্তবায়নে জাপানি পণ্যের কাস্টমস শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রক শুল্ক তুলে দিতে হবে। ফলে বাংলাদেশ বছরে ২৪৮.৩৪ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারাবে।

মান নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে জাপানে তৈরি পোশাক, পুরুষদের নন-নিট স্যুট, নিট সোয়েটার, নিট টি-শার্ট, ওভেন পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, হিমায়িত মাছ, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিক পণ্য ও খেলনা রপ্তানি হয়।
তবে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং মানসম্পন্ন সনদপত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পিছিয়ে থাকায় রপ্তানি আশানুরূপ বাড়ছে না।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “জাপানে পণ্য পাঠাতে আন্তর্জাতিক মান বড় একটি বিষয়। ইপিএ কার্যকর হলে বাজারে প্রবেশের বাধা থাকবে না, তবে মান ঠিক করতে না পারলে সুযোগ কাজে আসবে না।”
তিনি আরও জানান, জাপানে সামুদ্রিক মাছ ও চামড়াজাত পণ্যের ভালো চাহিদা রয়েছে। এছাড়া, পাটজাত পণ্যের চাহিদা পূরণে চীন থেকে আধুনিক মেশিন আনার সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে জাপানের চাহিদার সমন্বয় ঘটানো প্রয়োজন।
বিজিএমইএ-এর লক্ষ্য ও রোডশো
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, জাপানের বাজারে আগামী দিনে বার্ষিক পোশাক রপ্তানি ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অবস্থান তৈরি করতে জাপানে একটি রোডশো আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সক্ষমতা তুলে ধরা হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের সফরে ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন দুয়ার খুলবে।
সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক
১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে জাপানের স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৫০টিরও বেশি জাপানি কোম্পানি কাজ করছে এবং নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে গড়ে ওঠা জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় ভূমিকা রাখছে।
এছাড়া, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকা-টোকিও (নারিতা) রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সপ্তাহে ৩টি সরাসরি ফ্লাইট দুই দেশের যোগাযোগ ও বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করেছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আসন্ন শীর্ষ বৈঠকের মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় হবে।
আরো খবর
Continue to the category
- Advertisment -spot_img

Most Popular