২০২২ সালের দুটি হেবা ঘোষণার দলিলের তৃতীয় পাতার সপ্তম দফায় পরিবর্তনের অভিযোগ, পার্থক্যের কথা স্বীকার করেছেন সাব-রেজিস্ট্রার ও দুই কর্মচারী
আলামীন, রংপুর: রংপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে একই দলিল নম্বরের বিপরীতে সরবরাহ করা দুটি জাবেদা কপিতে ভিন্ন তথ্য পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ২০২২ সালে নিবন্ধিত দুটি হেবা ঘোষণার দলিলের তৃতীয় পাতার সপ্তম দফার বক্তব্য পরিবর্তন করে নতুন পাতা সংযোজন করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন এক অভিযোগকারী। এ বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার ও সংশ্লিষ্ট দুই কর্মচারী পরিবর্তনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছেন প্রতিবেদক।
অভিযোগকারীর দাবি, দলিলের তথ্য পরিবর্তনের ফলে প্রায় ৯০ লাখ টাকা মূল্যের জমির মালিকানা ও উত্তরাধিকার নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় রংপুর মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানায় এজাহার দিয়েছেন মো. নুরুজ্জামান ওরফে শাহীন (৬০)।
এজাহার ও ১১৯/২২ নম্বর বাটোয়ারা মামলা সূত্রে জানা যায়, ২৮৭৫/২০২২ ও ২৮৭৬/২০২২ নম্বর হেবা ঘোষণার দলিলের জাবেদা কপি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রংপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সংগ্রহ করা হয়। পরে ২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে একই অফিস থেকে দলিল দুটির নতুন জাবেদা কপি সংগ্রহ করেন তাঁরা।
অভিযোগকারীর ভাষ্য, আগের ও পরের জাবেদা কপি তুলনা করে তাঁরা গুরুতর অসংগতি দেখতে পান। উভয় দলিলের তৃতীয় পাতার সপ্তম দফার বক্তব্যে পার্থক্য পাওয়া যায়। তাঁদের অভিযোগ, পুরোনো পাতা সরিয়ে সেখানে কম্পিউটারে নতুন করে টাইপ করা পাতা সংযোজন করা হয়েছে। এ সময় কয়েকজন সাক্ষী উপস্থিত ছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্য অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২৮৭৫/২০২২ ও ২৮৭৬/২০২২ নম্বর হেবা ঘোষণার দলিল দুটি ১৪৪৩/০৩ ও ১৪৪৪/০৩ নম্বর হেবা বিল এওয়াজ দলিলের সূত্রে নিবন্ধিত হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। হেবা ঘোষণার দলিল দুটির দাতা ও গ্রহীতা দুই ভাই-বোন এ এস এম আতাউজ্জামান ও সৈয়দা রেজিনা জামান। পরে দলিলের পাতা ও দফার বক্তব্য পরিবর্তন করে ভিন্ন তথ্য সংযোজন করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, পরিবর্তিত দলিলের ভিত্তিতে অনলাইনে পুনরায় নামজারি ও খাজনা-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এমনকি জমি অন্যত্র বিক্রির চেষ্টাও করা হয়েছে। এতে পরিবারের অন্য উত্তরাধিকারীরা তাঁদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
একই দলিলের দুই জাবেদা, প্রশ্ন নথির নিরাপত্তা নিয়ে
অভিযোগের মূল বিষয় হলো, একই দলিল নম্বরের বিপরীতে সরবরাহ করা দুটি জাবেদা কপিতে ভিন্ন বক্তব্য থাকার দাবি। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে পাওয়া আগের ও পরের কপির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এতে সরকারি নথির সংরক্ষণ ও দলিলের সত্যতা যাচাই নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জমির মালিকানা, উত্তরাধিকার ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিল গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রমাণ। সরকারি দপ্তরে সংরক্ষিত নথির তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠলে জমির মালিকানা ও সাধারণ মানুষের সম্পত্তির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ৫৭ ধারায় নির্দিষ্ট নিবন্ধন বই পরিদর্শন ও সেখান থেকে সত্যায়িত অনুলিপি সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। একই আইনের ৬০ ও ৬১ ধারায় নিবন্ধন সনদ এবং নিবন্ধন-পরবর্তী কার্যক্রমের বিধান রয়েছে। ৮১ ধারায় ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে ভুলভাবে দলিল নকল, অনুলিপি বা নিবন্ধনের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার শামিমা পারভীনকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রংপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার সিংহের কাছে ২৮৭৫/২০২২ ও ২৮৭৬/২০২২ নম্বর দলিলের তৃতীয় পাতার সপ্তম দফা পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পরিবর্তনের সত্যতা স্বীকার করেন বলে জানিয়েছেন প্রতিবেদক।
একই বিষয়ে দলিল লিপিবদ্ধকারী কর্মচারী মোছা. সেলিনা ও উর্মী বেগমের কাছে জানতে চাইলে তাঁরাও দলিল দুটির তৃতীয় পাতার সপ্তম দফা পরিবর্তনের বিষয়টি স্বীকার করেন বলে প্রতিবেদক জানান।
তবে দলিলের তথ্য পরিবর্তনের কারণ, কার নির্দেশে এবং কী প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন করা হয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ এবং নথির প্রকৃত অবস্থা যাচাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।



