ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeআন্তর্জাতিকডেমোক্র্যাটদের বিজয় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ডেমোক্র্যাটদের বিজয় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

নিউজ ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পরাজিত করে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে দলটি। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের ক্ষমতার শেষ দুই বছরের জন্য ওয়াশিংটনে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আশা করছেন, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাঁর দেশের জন্য আরও মার্কিন সামরিক ও আর্থিক সহায়তার পথ খুলে দেবে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রকাশিত হতে শুরু করে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) তথ্য অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮টি আসনের সীমা অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে সিনেটের ১০০ সদস্যের কক্ষেও অন্তত ৫৪টি আসন নিশ্চিত করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি। কয়েকটি আসনের ফল তখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি।

এ জয়ের ফলে ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকানদের যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার অবসান ঘটল। ২০০৯ সালে বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদের পর এই প্রথম কোনো ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে বিরোধী দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও ডেমোক্র্যাটদের জয়
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল রিপাবলিকানদের ঐতিহ্যগত শক্তিশালী কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে জয় পাওয়া। টেক্সাস, কানসাস, আইওয়া, সাউথ ক্যারোলাইনা, নর্থ ক্যারোলাইনা, মেইন ও ওহাইওতে গুরুত্বপূর্ণ আসন দখল করেছে দলটি।
টেক্সাসে জেমস তালারিকো রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করেন। ১৯৯৪ সালের পর এই প্রথম অঙ্গরাজ্যটিতে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জয় পেলেন। কানসাসে অ্যাডাম হ্যামিলটন রিপাবলিকান রজার মার্শালকে হারিয়ে প্রায় এক শতাব্দীর ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ব্যবধান ভাঙেন। ১৯৩২ সালের পর অঙ্গরাজ্যটিতে এই প্রথম ডেমোক্র্যাটরা সিনেট আসন জয় করল।
এ ছাড়া আইওয়ায় জশ তুরেক, সাউথ ক্যারোলাইনায় অ্যানি অ্যান্ড্রুজ, নর্থ ক্যারোলাইনায় রয় কুপার এবং মেইনে ট্রয় জ্যাকসন জয়ী হয়েছেন। মিশিগানে আবদুল এল-সায়েদ রিপাবলিকান মাইক রজার্সকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের অপ্রত্যাশিত জয় ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও নেতৃত্বের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের প্রতিফলন।
উপরে বাঁ থেকে গভর্নর ক্যাথি হোকুল,লে. গভর্নর অ্যাড্রিয়েন অ্যাডামস, কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি মিক্স, কংগ্রেসম্যান হাকিম জেফরিস, কংগ্রেসওম্যান গ্রেস মেং, কংগ্রেসওম্যান ওকাসিও কার্টেজ, কংগ্রেসম্যান টম সুজি, কংগ্রেসম্যান ব্র্যাড ল্যান্ডার, রিচি টরেস, কংগ্রেসম্যান নিকোল ম্যালিওটাকিস, অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া ও স্টেট কম্পট্রোলার থমাস ডিনাপোলি। ছবি: সংগৃহীত।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্পের ওপর বাড়বে চাপ
কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা এখন ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমের ওপর আরও কার্যকর নজরদারি চালানোর সুযোগ পাবে। প্রতিনিধি পরিষদের বিভিন্ন কমিটি প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত, শুনানি এবং প্রয়োজনীয় নথি তলব করতে পারবে। সিনেটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের মনোনীত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ অনুমোদন বা আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকবে।
এ ছাড়া সরকারি ব্যয় অনুমোদন, নতুন আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির বাস্তবায়নে কংগ্রেসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ট্রাম্পের কোনো নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করা, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং অর্থ বরাদ্দ আটকে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা।
তবে কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই প্রেসিডেন্টের সব সিদ্ধান্ত বাতিল করা সম্ভব নয়। কোনো বিল পাসের পর প্রেসিডেন্ট ভেটো দিলে তা অতিক্রম করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। একইভাবে অভিশংসনের প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হলেও প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে অপসারণের জন্য সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব গ্রহণের পর ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেনকে সহায়তা এবং ইসরায়েলকে সামরিক সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়তে পারে।
ইউক্রেনকে আরও মার্কিন সহায়তার প্রত্যাশা জেলেনস্কির
মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলকে ইউক্রেনের জন্য ইতিবাচক সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম জেডডিএফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটরা ইউক্রেনকে সহায়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেছে।রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে প্রস্তুত ইউক্রেন: জেলেনস্কি
জেলেনস্কি বলেন, ‘আমি রিপাবলিকানদের প্রতিও কৃতজ্ঞ। তবে ডেমোক্র্যাটরা ইউক্রেনকে সমর্থন এবং সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে খুব স্পষ্টভাবে কথা বলেন। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার কথাও বলছেন। তাই ক্ষমতার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি হবে এবং আমরা আরও সহায়তা পাব—এমন আশা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, মার্কিন কংগ্রেস যদি ইউক্রেনের জন্য শক্তিশালী আর্থিক ও সামরিক সহায়তার ঘোষণা দেয়, তাহলে তা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
উল্লেখ্য, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইউক্রেনকে সরাসরি মার্কিন আর্থিক ও সামরিক সহায়তা অনেকাংশে বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া কিয়েভের জন্য নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আহ্বান
ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য নতুন মার্কিন কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেছেন, নতুন কংগ্রেস ইউক্রেনকে সমর্থন অব্যাহত রাখবে এবং রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়াবে বলে তিনি আশা করেন।
তিনি বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করলে তাদের শক্তি অনেক বেশি হবে। যৌথ চাপের মাধ্যমে মস্কোকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করা সম্ভব হতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুলও ডেমোক্র্যাটদের বিজয়কে ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে নতুন উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ইউক্রেনকে সহায়তার বিষয়টি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের আলোচনায় নতুন করে গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস এ বিষয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, গত দুই বছর ট্রাম্প অনেক ক্ষেত্রে কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে দেশ পরিচালনা করেছেন। ফলে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের পরও তাঁর পররাষ্ট্রনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, মস্কো আশা করে ট্রাম্প তাঁর শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।
আবুধাবিতে রাশিয়া-ইউক্রেন আলোচনা ঘিরে নতুন প্রত্যাশা
এদিকে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও এগিয়ে চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর আবুধাবিতে ইউক্রেন ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদলের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে যুদ্ধের অবসান, ইউক্রেনের যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং উত্তেজনা প্রশমনের বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।যুদ্ধ বন্ধে আবুধাবিতে প্রথমবারের মতো ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে রাশিয়া, ইউক্রেন ও  যুক্তরাষ্ট্র | The Business Standard
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, বৈঠকের প্রস্তুতি নিয়ে উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে তাঁর বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে আলোচনা পূর্ণ গতিতে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন এবং ইউক্রেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে ইউক্রেনের ব্যাপক প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছে। ফলে মার্কিন কংগ্রেসে ক্ষমতার পরিবর্তন কিয়েভের সামরিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নতুন কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বিশ্ব
ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। ইউক্রেনকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, ইরান যুদ্ধ এবং ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কংগ্রেসের ভূমিকা বাড়তে পারে।
তবে নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হবে আগামী জানুয়ারিতে। ততদিন ট্রাম্প প্রশাসনের হাতেই নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে। ফলে নির্বাচনের ফলাফল ইউক্রেনের জন্য আশাব্যঞ্জক হলেও যুদ্ধের গতিপথে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।-
সব মিলিয়ে ডেমোক্র্যাটদের এই বিজয় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং ইউক্রেনের জন্য নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী বছর নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউক্রেনকে সহায়তা এবং রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর বিষয়ে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।
আরো খবর
Continue to the category
- Advertisment -spot_img

Most Popular