আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দীর্ঘদিন ধরে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, চলতি বছরেই তিনি দেশে ফিরতে চান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম NDTV-কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ ইমেইল সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি এ বছরই আমার দেশে ফিরব। কোনো বাধা বা ষড়যন্ত্র আমাকে থামাতে পারবে না।” তাঁর এই বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে নয়; বরং তিনি দাবি করেন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তিনি দেশে ফিরতে চান। মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তিনি মৃত্যুকে ভয় পান না এবং তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। তাঁর ভাষায়, “সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো হামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ওপর হামলা।” তিনি দাবি করেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহাবস্থান বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হওয়া উচিত।
সাক্ষাৎকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের (OHCHR) প্রতিবেদন। শেখ হাসিনার আইনি পরামর্শক, লন্ডনের Doughty Street Chambers-এর ব্যারিস্টার স্টিভেন পাওয়েলস কেসি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে প্রতিবেদনের কয়েকটি মূল উপসংহার পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালে প্রকাশিত OHCHR প্রতিবেদনে আন্দোলন চলাকালে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হওয়ার যে অনুমান তুলে ধরা হয়েছিল, তা পরবর্তী সরকারি নথি ও অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে ওই সংখ্যাটি প্রকাশ্যে সংশোধন বা পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ওই প্রতিবেদন প্রত্যাহার বা সংশোধনের কোনো ঘোষণা দেয়নি। জাতিসংঘের অবস্থান অনুযায়ী, তাদের অনুসন্ধানে যুক্তিসঙ্গতভাবে বিশ্বাস করার মতো ভিত্তি পাওয়া গেছে যে আন্দোলনের সময় ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন সংঘটিত হয়েছিল এবং নিহতের সংখ্যা প্রায় ১,৪০০ হতে পারে। ফলে শেখ হাসিনার আইনজীবীর দাবিগুলো বর্তমানে একতরফা আইনি অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং সেগুলো এখনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সিদ্ধান্ত নয়।
বর্তমান নির্বাচিত সরকারের অবস্থানও এ বিষয়ে স্পষ্ট। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান বিচার ও দণ্ডাদেশ দেশের প্রচলিত আইন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় হয়েছে। সরকার বলছে, এসব মামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়; বরং অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি। একই সঙ্গে বর্তমান প্রশাসন আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত পদক্ষেপকে বহাল রেখেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ভারত চলে যান। পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলায় বিচার সম্পন্ন হয় এবং অনুপস্থিত অবস্থায় দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ ও রায়কে ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। অন্যদিকে বর্তমান সরকার বলছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই বিচারিক প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে।-
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “এ বছরই দেশে ফিরব”— শেখ হাসিনার এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে তাঁর প্রত্যাবর্তন বাস্তবে কখন, কীভাবে এবং কোন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্ভব হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশিত হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা ও কূটনৈতিক পর্যায়ে আগ্রহ বাড়লেও বাস্তব পরিস্থিতি নির্ভর করবে আদালতের সিদ্ধান্ত, সরকারের অবস্থান এবং ভবিষ্যতের প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপের ওপর।
সূত্র: এনডিটিভি




