স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও স্বীকৃতি পাননি দেশের আদিবাসীরা। সাংবিধানিক স্বীকৃতি, সামাজিক, রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ভাষা, শিক্ষা-সংস্কৃতি রক্ষার স্বপ্ন নিয়ে বছরখানেক আগে তারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। পরিবর্তিত সময়েও তাদের দিকে কেউ ফিরে তাকায়নি। বিভিন্ন খাত সংস্কারে নানা কমিশন গঠন করলেও আদিবাসীদের উন্নয়নে এখন পর্যন্ত কোনো কমিশন গঠন করেনি সরকার।
আজ শনিবার আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। জাতিসংঘ এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে, ‘আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যৎ গঠনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সার্থক প্রয়োগ’। দিবসটি সামনে রেখে দেশের আদিবাসী নেতারা অবহেলিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত আদিবাসীদের উন্নয়নে একটি স্বতন্ত্র আদিবাসী বিষয়ক কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমানে পৃথিবীর ৯০টি দেশে আদিবাসী প্রায় ৪৮ কোটি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশে ৫০টি জাতি-গোষ্ঠীর প্রায় ৩০ লাখ আদিবাসী রয়েছেন। তারা দীর্ঘকালের অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া মানুষ।
আদিবাসী নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সারাদেশের ছাত্র-জনতার সঙ্গে ব্যাপকভাবে আদিবাসী ছাত্র-জনতা ও তরুণরা অংশগ্রহণ করেন। দীর্ঘদিনের বৈষম্য-বঞ্চনার অবসান ঘটাতে একটি স্বপ্ন নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন তারা। গত এক বছরে তাদের স্বপ্ন, আশা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং সমকালকে বলেন, গত এক বছরে রাষ্ট্রের নানা বিষয়ে এত এত সংস্কার কমিশন হয়েছে; আদিবাসী সংস্কার কমিশন এখনও হয়নি। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের ভেতর থেকে কেউ কিছু বলেনি। দেশে মূলত তারাই বৈষম্যের শিকার। তাদের জন্যই তো কমিশন হওয়া প্রয়োজন ছিল। এখনও সময় আছে আদিবাসীদের জন্য একটি স্বতন্ত্র কমিশন গঠনের। এই কমিশন গঠন করা হলে এক থেকে দুই মাস কাজ করে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দেওয়া সম্ভব হবে। এতে আদিবাসী বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার কর্মীসহ আদিবাসীদের সুহৃদরা থাকতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত নানা সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। ওই সব কমিশনে আদিবাসীদের অর্থপূর্ণ কোনো অংশগ্রহণও নেই। কোনো কমিশনের সভায় আদিবাসীদের ডাকাও হয়নি। শুধু নারী কমিশনে আদিবাসীদের প্রতিনিধি হিসেবে একজনকে রাখা হলেও সেটি ছিল নামমাত্র। যদিও পরবর্তী সময়ে এই কমিশন বাতিল করা হয়।
আদিবাসী এই নেতা বলেন, কমিশনের উপদেষ্টা থাকতে পারেন প্রধান উপদেষ্টা। নেপালে রাজতন্ত্র বিলুপ্তির সময় দেশটির আদিবাসী ‘জানা জাতি’র স্বীকৃতির যে কমিটি হয়েছিল, সেই কমিটির উপদেষ্টা ছিলেন দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী।
দেশের পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীরা নানা কারণে ঐতিহাসিক অবিচারের শিকার। এই কারণে তাদের ভূমির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি। সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি। অনেকে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, অনেকে গ্রামে সব হারিয়ে শহরে আশ্রয় নিচ্ছে।
আদিবাসী নেতারা বলেন, আদিবাসীদের জন্য কোনো কমিশন গঠন করা হলে এই কমিশনের কাজ হবে সংবিধানে আদিবাসীদের স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক অধিকার, ভূমি, বনসহ অন্য সম্পদের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা। এছাড়া ভাষা, সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার, সমতলের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আদিবাসী প্রতিনিধির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
বর্তমানে আদিবাসীদের কোনো প্রতিনিধি সংসদে নেই, বিচার বিভাগে নেই। চাররিতে আগে কোটা ছিল সেটিও আজ নেই। পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ নেই। তারা আদিবাসীদের জন্য একটি জাতীয় নীতিমালা করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা দীপায়ন খীসা সমকালকে বলেন, বর্তমান সরকার অনেক সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। সেই কমিশনগুলোতে আদিবাসী জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। গা-ছাড়াভাবে কিছু মতামত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কোনো বৈঠকে আদিবাসী সংগঠন আমন্ত্রিত হয়নি। সংবিধান সংস্কার কমিশনে বহুত্ববাদের ধারণা যুক্ত করলেও আদিবাসী জাতিগুলোর পরিচিতি ও অধিকারের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো বিধান যুক্ত হয়নি। সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের দাবিটিও উপেক্ষিত। অন্য খাতের সংস্কার কমিশনের মতো আদিবাসীবিষয়ক পৃথক কমিশন গঠনের দাবি জানান তিনি।
জনসংহতির এ নেতা বলেন, সকল জাতির সম্মানজনক অংশীজন হওয়ার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করার লক্ষ্য নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ধারণ করতে হবে।
আজ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আদিবাসী জাতি-গোষ্ঠীর মানুষেরা দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে।
এতে সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা।



