সুমন দত্ত
বাংলাদেশে নতুন কেউ ক্ষমতায় আসলে সবার আগে জ্বালানি খাতে হাত দেয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কয়েক দফায় দাম কমিয়ে আবার দাম বৃদ্ধি করেছিল এলপিজি সিলিন্ডারের। সংকটের শুরু তখন থেকেই। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই হরমুজ সমস্যা দেখা দেয়। তারপরও সরকার ৬ মাস পার করে দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়। দাম বৃদ্ধি হলেও সংকট থেকে যাচ্ছে।
দাম বাড়িয়ে সংকট মেটানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকেই তেল কিনে। তেলের বিকল্প বাজার খোঁজ করেনি। রাশিয়ার তেলের বিষয়ে একবার আওয়ামী লীগের কৃষি মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাককে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তখন মন্ত্রী বলেছিলেন, আমাদের সেই সাহস নেই। আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়ে যেতে পারি। ভারত কেন পারে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারতের সেই সক্ষমতা আছে। তাদের মতো শক্তিশালী কূটনীতি আমরা করতে পারি না।
তখন কিন্তু রাশিয়ার তেলের বিষয়ে বাংলাদেশের ওপর মার্কিন কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। আমাদের সবার মনে আছে রুপপুর পরমাণু বিদ্যুতের সরঞ্জাম সম্পর্কে। মার্কিন আপত্তির কারণে রাশিয়ার জাহাজ বাংলাদেশের কোনো বন্দরে তা খালাস করতে পারেনি।
একই জাহাজ ভারতে যেয়ে মাল খালাস করে অবশেষে। তার আগে কয়েক সপ্তাহ আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করছিল সেই জাহাজ। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানকে প্রশ্ন করলে উত্তর না দিয়ে তিনি সাংবাদিকদের সাংবাদিকতা নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেন। প্রশ্নকারী “এখন” টিভির সাংবাদিক কে প্রশ্ন করার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। পরে জানা গেল আরো কয়েক সাংবাদিকের সঙ্গে এই মন্ত্রী দুর্ব্যবহার করেছেন। এই মন্ত্রীর অবস্থান এখন কোথায় তা কেউ জানে না।
বিএনপি সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে। এখন একে ভিত্তি করে সরকারের সমালোচনা করা কতটা যৌক্তিক। আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতা নিয়েছিল। তখন গ্যাসের সংকট ছিল না। তারপরও কয়েক দফায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করা হয়েছিল। গণ পরিবহনের ভাড়া এক লাফে ১০-১৫ টাকায় পৌঁছে যায়। আমার মনে আছে ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দিল বিআরটিসির সর্বনিম্ন ভাড়া হবে ১০ টাকা।
তখন বিআরটিসিকে সর্বনিম্ন ভাড়া দিতে হতো ৫ টাকা। এদিকে সরকারি গাড়ির ভাড়া বৃদ্ধি দেখে প্রাইভেট কোম্পানির বাস মালিকরা যেখানে ২ টাকা ছিল সর্বনিম্ন। তারা রাতারাতি ১০ টাকা করে ফেলে। ২০০৮ সালে সদরঘাট থেকে গুলিস্তান যেতে ২টা লাগত। ওবায়দুল কাদেরের কারণে এক লাফে ৭ টাকা বেড়ে যায় গুলিস্তানের ভাড়া। যা এখনো বহাল আছে।
আমাদের দেশে পেট্রল ডিজেলের দাম কখনই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধরা হয়নি। দেখা গেছে আন্তর্জাতিক বাজারে বেন্ট্র ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৫০ ডলারের নিচে হলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন নেই। সরকারের রেগুলেটরি কমিশনে যুক্তি এক্ষেত্রে সমন্বয় করা হচ্ছে। অর্থাৎ দাম যখন বেশি থাকে তখন দাম বাড়ানো হয় না। যখন কম থাকে তখন সেই সময় তা সমন্বয় করা হয় দাম না বাড়িয়ে।
এই কৌশল আমাদের দেশের দীর্ঘদিনের। প্রতিবেশী ভারতও বাংলাদেশের এই কৌশল ফলো করছে। তারা রাশিয়া কিংবা অন্য কোনো দেশ থেকে কম দামে তেল কিনলেও দেশের জনগণকে সেই দামে তেল বিক্রি করে না। দেশের বাজারে একটি নির্দিষ্ট অংকে তেল বিক্রি করে। যার সঙ্গে তেল আমদানির কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে বাংলাদেশের নতুন সরকারের ব্যর্থতা অন্য জায়গায়। যেকোনো পণ্য কিনতে গেলে আমেরিকার অনুমতি। আমেরিকার সঙ্গে যে দেশগুলোর সম্পর্ক ভালো সেই দেশগুলোকে আমাদের বেছে নিতে হবে বাণিজ্য করার জন্য। তবে সবার আগে আমেরিকার বাজার পরখ করে দ্বিতীয় অপশনে যেতে হবে। লীগ সরকারের আমলে এমন বিষয় ছিল না। ইউনুস সরকারের শেষ সময়ে করা এই গোপন চুক্তি বাংলাদেশের পারচেজ ক্ষমতা সীমিত করে দিয়েছে।
এখন বাংলাদেশকে ভাবতে হবে এই চুক্তির ফলে যে সুবিধা মার্কিন বাজারে পাওয়া যাবে তার ফায়দা তোলা। যেমন বাংলাদেশ যদি আমেরিকার তুলা দিয়ে সুতা বানায় তাদের মার্কেটে তা জিরো ট্যাক্স সেই সব পণ্যে। আর ভারত থেকে তুলা কিনে সুতা বানালে উচ্চ শুল্ক আরোপ হবে সেই সব পণ্যে।
জ্বালানির বিষয়ে তারেক রহমান সরকারের একটি বড় ঘোষণা ১০০ টি কূপ খননের। এই কূপ খনন এতদিন বন্ধ ছিল ভারত ও আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। ভারত আমেরিকাকে দিয়ে আমাদের দেশের গ্যাস ভারতে রপ্তানির চাপ দিয়েছিল। এজন্য লীগ সরকার এই কূপ খননের কাজ বন্ধ রেখেছিল। বর্তমান সরকারের সাহসী সিদ্ধান্ত দেশকে নিজ পায়ে দাঁড়াতে সহায়তা করবে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের করা জ্বালানি চুক্তিগুলি রিভিউ করা হচ্ছে। এতে বাংলাদেশ সরকারের দাবি নেপাল ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আনার সুযোগ করে দিক ভারত। এদেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক রুট চালু করতে ভারতের সহায়তা লাগবে। সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। আগামীতে তারেক রহমানের ভারত সফরে হয়ত এ বিষয়গুলো নিয়ে বসবে দুই দেশের সরকার প্রধান। হয়ত তখন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সম্পর্ক ভালোর দিকে যাবে।
লেখক সাংবাদিক, প্রধান প্রতিবেদক, ঢাকানিউজ২৪ডটকম, তারিখ ২৪/৯/২০২৫



