ঢাকা  বৃহস্পতিবার, ১৬ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১লা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসর্বশেষঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ৫ প্রধান রুট চিহ্নিত

ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ৫ প্রধান রুট চিহ্নিত

নিউজ ডেস্ক:  ঢাকা মহানগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও ফিটনেসবিহীন বাসের চলাচল কমাতে উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।

এর অংশ হিসেবে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি চালুর জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাঁচটি প্রধান রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে একক বাসমালিকের পরিবর্তে কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ডিটিসিএর বাস রুট র‌্যাশনালাইজেশন (বিআরআর) প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত এক সমীক্ষায় বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাঁচটি প্রাথমিক রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে চালু থাকা ৯৮টি বাস রুটের তথ্য এবং যাত্রী চলাচলের ট্রাফিক মডেল বিশ্লেষণ করে এসব রুট নির্বাচন করা হয়েছে।

সমীক্ষায় যাত্রীদের চলাচলের উৎস ও গন্তব্য, বাসের চাহিদা, সড়কের অবস্থা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের যানবাহন চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। রাজধানীর ৫২টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন গণনা এবং ড্রোনের সাহায্যে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের প্রকৌশলগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

আগে প্রস্তাবিত ৩২টি প্রাথমিক রুটের মধ্য থেকে যাত্রী চাহিদা, বাসের পর্যাপ্ততা ও সড়কের পরিস্থিতি বিবেচনা করে পাঁচটি রুটকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

প্রথম রুটটি বেরাইদ-ভাটারা-সদরঘাট। ১৯ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রুটে দৈনিক যাত্রী চাহিদা ১ লাখ ২০ হাজার ৮৭৮ জন। ডিটিসিএর সমীক্ষা অনুযায়ী, এটি পাঁচটি রুটের মধ্যে সর্বোচ্চ যাত্রী চাহিদাসম্পন্ন। রুটটি রামপুরা, খিলগাঁও, সায়েন্স ল্যাব ও ধোলাইখাল হয়ে পরিচালিত হওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

দ্বিতীয় রুটটি নন্দন পার্ক থেকে ডেমরা পর্যন্ত। ৫৬ দশমিক ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রুটে দৈনিক যাত্রী চাহিদা ৮৬ হাজার ৫০৯ জন। দীর্ঘ হওয়ায় রুটটি দুই বা তিনটি খণ্ডে ভাগ করার প্রস্তাব রয়েছে। এ রুট জিরানী, কামারপাড়া, আবদুল্লাহপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, নতুন বাজার, বাড্ডা, মালিবাগ রেলগেট, সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী হয়ে চলবে।

তৃতীয় রুট কাঁচপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত। ৪৩ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রুটে দৈনিক যাত্রী চাহিদা ৮৫ হাজার ২৬৬ জন। প্রস্তাবিত রুটটি সাইনবোর্ড, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, বাসাবো, খিলগাঁও, টঙ্গী, চেরাগ আলী ও বোর্ডবাজার হয়ে পরিচালিত হবে।

চতুর্থ রুট কোনাবাড়ী থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত। ৪১ দশমিক ৬২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রুটে দৈনিক যাত্রী চাহিদা ৬০ হাজার ৮৯০ জন। রুটটি কড্ডা, ভোগড়া, টঙ্গী, আবদুল্লাহপুর, বিমানবন্দর, মহাখালী, জাহাঙ্গীর গেট, বিজয় সরণি, শাহবাগ, বাংলামোটর, মৎস্য ভবন, প্রেসক্লাব, পল্টন, গুলিস্তান ও বাবুবাজার হয়ে পরিচালিত হবে।

পঞ্চম রুট শ্রীপুর থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত। এ রুট রাজেন্দ্রপুর, সালনা, গাজীপুর চৌরাস্তা, চেরাগ আলী, চেয়ারম্যানবাড়ী, মহাখালী, জাহাঙ্গীর গেট, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাব ও আজিমপুর হয়ে যাওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

বর্তমানে অনুমোদিত ৪১৮টি বাস রুটের মধ্যে ৯৮টি রুটে বাস চলাচল করছে বলে ডিটিসিএর তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব রুটে বিভিন্ন কোম্পানির নামে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাসও চলাচল করছে।

এর আগে রাজধানীকে ৯টি ক্লাস্টারে ভাগ করে রংভিত্তিক বাসসেবা চালুর জন্য ৪২টি রুট চিহ্নিত করা হয়েছিল। ‘নগর পরিবহন’ নামে কয়েকটি রুটে বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও কার্যকর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেবাটি টেকসই হয়নি।

ডিটিসিএ জানিয়েছে, প্রস্তাবিত পাঁচটি প্রধান রুট দিয়ে ঢাকার ভেতর ও আশপাশের সব এলাকার পরিবহন চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। এ কারণে মূল রুটের পাশাপাশি সার্কুলার ও ফিডার বাসসেবা চালুর প্রয়োজন হবে। এ লক্ষ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) প্রস্তাবিত ২৫টি সার্কুলার রুটও ডিটিসিএ মূল্যায়ন করছে।

গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে একক বাসমালিকের পরিবর্তে কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থায় বাসের ফিটনেস, শৃঙ্খলা ও আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে কোম্পানিকে দায়বদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।

সম্প্রতি ডিটিসিএতে বাসমালিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক যৌথ সভায় ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা ও সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।

সভায় উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, ঢাকার প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সড়ক নেটওয়ার্কের মধ্যে বাস চলাচলের উপযোগী সড়ক রয়েছে প্রায় ২৮০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬৮ কিলোমিটার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১১২ কিলোমিটার।

সভায় ৯৮টি বাস রুটকে পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি মূল রুট করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি রুটে নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে ১২ মিটার দীর্ঘ ও ৫২ আসনবিশিষ্ট আধুনিক নগর বাস চালুর পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকার এখন থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কোম্পানির সঙ্গে কাজ করতে চায়। বাসের ফিটনেস ঘাটতি, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ বা পরিবহন ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে জবাবদিহির আওতায় আনার কথা জানান তিনি।

নিয়ম অমান্যকারী বাসমালিককে কোম্পানি থেকে বহিষ্কারের ব্যবস্থার কথাও তিনি বলেন। কাউন্টার থেকে অতিরিক্ত বুকিং ফি বা অবৈধ চাঁদা আদায় বন্ধ করার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, চালকদের আচরণ ও সেবার মানে উন্নতি না হলে রুট পারমিট বাতিল করে বিকল্প বাসসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, যাত্রী নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নয়ন ছাড়া ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে না। মূল সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং এ বিষয়ে জোনভিত্তিক নীতিমালা করার কথাও তিনি জানান।

পরিবহন খাতের সংকট তুলে ধরে বাসমালিক প্রতিনিধিরা যন্ত্রাংশ, চ্যাসিস, টায়ার ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কথা বলেন। একই সঙ্গে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘এক রুট এক কোম্পানি’ মডেলের প্রস্তাব দেন তারা।

চুক্তিভিত্তিক ‘জমা’ পদ্ধতির পরিবর্তে চালক ও কন্ডাক্টরদের নির্দিষ্ট বেতন চালুর দাবি জানান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম। আগামী দুই মাসের মধ্যে মহানগরের বাসগুলোর মেরামত, ডেন্টিং ও রং করার উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।

তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মেরামত না করা হলে জীর্ণ বাসগুলো চলাচল থেকে বিরত রাখা হবে। পাশাপাশি সড়ক তদারকিতে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে এলাকাভিত্তিক মালিকদের বিশেষ টিম গঠনের কথা জানান তিনি।

নির্ধারিত বাসস্টপ ছাড়া অন্য কোথাও যাত্রী না তোলা এবং নির্দিষ্ট স্টপেজে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান চালকদের পেশাগত নিরাপত্তা, নির্দিষ্ট ডিউটি সময় ও প্রশিক্ষণের দাবি জানান। তিনি দাবি করেন, গত ১৫ বছরে অধিকাংশ চালকের বৈধ লাইসেন্স বা সনদ নেই।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের আলোচনায় গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কারে কয়েকটি সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব উঠে এসেছে।

প্রথমত, ঢাকা মহানগরীর বাসসেবা কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকার একক বাসমালিকের পরিবর্তে কোম্পানির সঙ্গে প্রশাসনিক লেনদেন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করছে।

দ্বিতীয়ত, বাসের ফিটনেস ঘাটতি, শৃঙ্খলাভঙ্গ ও আইনগত অনিয়মের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। নিয়মভঙ্গকারী মালিককে কোম্পানি থেকে বহিষ্কারের প্রস্তাবও রয়েছে।

তৃতীয়ত, কাউন্টারে অবৈধ চাঁদা ও অতিরিক্ত বুকিং ফি বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবার মান ও চালকদের আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না এলে রুট পারমিট বাতিলসহ বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

চতুর্থত, আগামী দুই মাসের মধ্যে মহানগরে চলাচলরত জীর্ণ ও পুরোনো বাসের বডি মেরামত, ডেন্টিং ও রং করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মেরামত না করা বাস চলাচল থেকে বিরত রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।

পঞ্চমত, অনুমোদনহীন, ফিটনেসবিহীন ও রুট পারমিটের শর্ত লঙ্ঘনকারী বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে এলাকাভিত্তিক তদারকি টিম গঠনের কথা বলা হয়েছে।

ষষ্ঠত, বাসগুলোকে নির্দিষ্ট কাউন্টার ও স্টপেজভিত্তিক পরিচালনা এবং নির্ধারিত বাসস্টপে যাত্রী ওঠানামা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

সপ্তমত, কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার রূপরেখা তৈরিতে বাসমালিক, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে যৌথ বৈঠকের মাধ্যমে পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular