ময়মনসিংহ ব্যুরো : বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ( বাকৃবি) বহিরাগতদের হামলার পর ক্যাম্পাসে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় সিন্ডিকেটের জরুরি সভায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ ও হল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী হল ছাড়েনি। দফায় দফায় রাস্তায় নেমে লাঠি নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে এবং ৬ দফা দাবি পেশ করে। বর্তমানে ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ক্যাম্পাসের বাইরে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
শতভাগ দাবি মানার পরও ২২৭ শিক্ষককে আট ঘণ্টা অবরুদ্ধ রাখা হয়। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের বের করে নেয়ার সময় ধাক্কাধাক্কিতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়। উত্তেজনাকর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য্য ধারণ করার আহবান জানিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ হেলাল উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্যে জানান, বিগত ০৭.০৮.২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন ও ভেটেরিনারি অনুষদের ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের চাকুরির ক্ষেত্র বাড়ানো এবং চাকুরির পাওয়ার নিশ্চয়তায় ভেট সায়েন্স এন্ড এ এইচ কম্বাইন্ড ডিগ্রীর দাবী সম্বলিত স্মারকলিপি মাননীয় ভাইস-চ্যান্সেলর-এর নিকট প্রদান করে। এ প্রেক্ষিতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি দ্রুত সমাধানকল্পে গত ১২.০৮.২০২৫ তারিখের নং শা-১/৯৬২/শিক্ষা মূলে একটি কমিটি গঠন করে। ছাত্র-ছাত্রীদের দাবী এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনকল্পে গঠিত কমিটি অত্যন্ত আন্তরিকতা ও গুরুত্বের সাথে পশু পালন ও ভেটেরিনারি অনুষদের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে আলাদা আলাদা ভাবে এবং উভয় অনুষদের ছাত্র-ছাত্রীদের একসঙ্গে নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। কমিটি ভেটেরিনারি অনুষদের বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ, ভেটেরিনারি ও পশু পালন অনুষদের শিক্ষকবৃন্দ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা, মাননীয় শিক্ষা উপদেষ্টা, ভেটেরিনারি কাউন্সিলের কর্মকর্তাবৃন্দ, বাংলাদেশ এনিমেল হাজবেন্ড্রী এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সম্মানিত মহাপরিচালকসহ সকল অংশীজনদের সাথে মতবিনিময় করে একটি সুপারিশমালা প্রদান করে। কমিটির সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত ৩১.০৮.২০২৫ তারিখ সকাল ১১:০০ টায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনে একাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি সভা আহ্বান করা হয়। সভায় উপস্থিত ২৫১ জন শিক্ষকের মধ্যে ১৬ জন শিক্ষক বিস্তারিত আলোচনা করেন, তার মধ্যে প্রাথমিকভাবে ২/৩ জন শিক্ষকের দ্বিমত থাকলেও পরবর্তীতে কমিটির প্রস্তাবিত ৬টি সুপারিশমালা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।
উল্লেখ্য যে, একাডেমিক কাউন্সিলের সভা শেষ হওয়ার পূর্বেই জানা যায় যে, সভার সিদ্ধান্তে ছাত্র-ছাত্রীরা সন্তুষ্ট ও উৎফুল্ল হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর জন্য তারা প্রস্তুত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কোন স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে বা ইশারায় পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। ছাত্র-ছাত্রীরা একাডেমিক কাউন্সিল সভায় উপস্থিত ২৫১ জন শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দসহ প্রায় ৩০০ জনকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনে তালাবদ্ধ করে জিম্মি করে। শিক্ষকদের মধ্যে যেমন ছিলেন বয়োবৃদ্ধ ষাটোর্ধ শিক্ষকরা, তেমনি ছিলেন হৃদরোগী, ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত ও শারিরীক ভাবে অসুস্থ শিক্ষকরা এবং গর্ভবতী মহিলা শিক্ষক। অনেক মহিলা শিক্ষকরা যারা ছোট ছোট সন্তানদের বাসায় রেখে শুধুমাত্র পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় যোগ দিতে এসেছিলেন। দুপুরের তীব্র গরমে অতিষ্ট হয়ে ও অভুক্ত অবস্থায় প্রশাসন ও আটকে পড়া শিক্ষকরা কোনরূপ শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা না করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনার চেষ্টা চালিয়ে যান, এবং বারবার শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনায় বসার জন্য অনুরোধ জানান। তদুপরি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এই অনুরোধে কোনরূপ কর্নপাত করেনি। শিক্ষকদের হাজারও ভোগান্তি, গরমে অতিষ্ঠ হওয়া ও অভুক্ত অবস্থার কথা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিবেচনায় নেয়নি। পরবর্তীতে শেষ বিকেলের দিকে আটকে পড়া শিক্ষকদের স্বজন, বয়স্ক বাবা-মা এবং কিছু এলাকাবাসীও ছিলো তারা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার প্রেক্ষিতে অডিটরিয়ামের চারপাশে জড়ো হওয়া শুরু করে। তদুপরি আটকে পড়া শিক্ষকরা ধৈর্য্য হারা হননি ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যান কোনরূপ বল প্রয়োগ ছাড়া। এ সময় জেলা প্রশাসক ও উর্ধ্বতন পুলিশ প্রশাসন আন্দোলরত শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তীব্র গরমে, মানসিক ট্রমা ও ক্ষুধায় কয়েকজন মহিলা শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের বের হতে দেয়ার অনুরোধ করা হয়, কিন্তু আন্দোলরত শিক্ষার্থীরা এতে কোনরূপ কর্নপাত না করে তাদের দাবীতে অটল থাকে। দফায় দফায় ছাত্র-ছাত্রীদেরকে তাদের কাঙ্খিত দাবীর
বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে মর্মে বুঝানোর চেষ্টা করা হলেও তারা অজ্ঞাত কারণে তা বুঝতে চেষ্টা করেনি বরং
নারী ও বয়স্ক শিক্ষকবৃন্দসহ সকলকে প্রায় ৮ ঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে অডিটরিয়ামের দক্ষিণ ও মুক্তমঞ্চের দিকের গেট কে বা কাহারা তালা ভেংগে খুলে দেয় এবং সারাদিন আটকে থাকার পর বের হবার সুযোগ পেয়ে আটকে পড়া শিক্ষকরা সবাই বের হয়ে আসেন। এ সময় আন্দোলনকারী ছাত্ররা বাঁধা দিতে আসলে কয়েকজনের সাথে ধাক্কাধাক্কি হয়। এতে কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী আহত হয়েছে জেনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মর্মাহত এবং আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছে। ইতোমধ্যে আহতদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কথা বলে দুঃখ প্রকাশ করেছে।
উল্লেখ্য যে, শিক্ষকদের বাসা থেকে আগত স্বজন/কর্মচারী ও বিভিন্ন শুভানুধ্যায়ীদের যারা অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল, তাদেরকে ঢালাওভাবে বহিরাগত হিসেবে আখ্যা দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে উত্যপ্ত করা হয়েছে এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে। গেট দুটোর তালা কে বা কাহারা ভেঙ্গেছে তা তৎক্ষনাত জানা যায়নি। এটা বাইরে থেকে আটকে পড়া শিক্ষকদের স্বজন কিংবা তাদের পরিচিত এলাকাবাসী বা কর্মচারীদের কেউ করেছে কি না- তা তদন্ত সাপেক্ষ। এ ব্যাপারে বহিরাগত কেউ জড়িত থাকলে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে অবশ্যই শান্তির আওতায় আনা হবে।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে যে, ছাত্র-ছাত্রীদের দাবীর প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আন্তরিকতা প্রদর্শণ করে তা পূরণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে শিক্ষকবৃন্দকে মুক্ত করার পর একটি স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করতে বিভিন্ন স্থাপনায় ভাংচুর চালায়। ছাত্র-ছাত্রীদের দাবীর বাইরে এ পরিস্থিতি সৃষ্টির পায়তারা গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মনে করছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় গত ৩১.০৮.২০২৫ তারিখ রাত ৯:৩০ টায় বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের জরুরি (ভার্চুয়্যাল) সভা আহবান করা হয়। সভায় বিশ্ববিদ্যালয় আইন শৃঙ্খলা জেলা প্রশাসনের নিকট ন্যস্ত করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্লাশ ও পরীক্ষা বন্ধ থাকবে মর্মে সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ক্ষুন্নকারী এবং সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের উপর হামলাকারী যেই হোক, তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অতিদ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করবে এবং তদন্তসাপেক্ষে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্র-ছাত্রীদের ন্যায্য দাবী পূরণে সর্বদা সচেষ্ট ছিল, আছে এবং থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ স্থিতিশীল ও শৃঙ্খলাময় রাখার প্রত্যয়ে সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।



