ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeজাতীয়ব্রহ্মপুত্রে চীনের বাঁধ: পানিযুদ্ধে কতটা ভুগবে বাংলাদেশ

ব্রহ্মপুত্রে চীনের বাঁধ: পানিযুদ্ধে কতটা ভুগবে বাংলাদেশ

চীন আনুষ্ঠানিকভাবে তিব্বতের ব্রহ্মপুত্র নদে বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করেছে। যেটিতে ব্যয় হবে ১৬৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু বাঁধের স্থানটি ভারতের অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় হওয়াতেই দিল্লি-বেইজিংয়ের মধ্যে পানি নিয়ে উত্তেজনার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা শিনহুয়ার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং বাঁধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় তিব্বতের মেইনলিং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে।

ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য মিন্ট জানিয়েছে, স্থানীয় তিব্বতীয়দের কাছে এ অংশের ব্রহ্মপুত্র ‘ইয়ারলুং সাংপো’ নামে পরিচিত। এখানেই নদটি ইংরেজি অক্ষর ‘ইউ’ আকৃতির বাঁক নিয়ে অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করেছে এবং সেখান থেকে বাংলাদেশের দিকে প্রবাহিত হয়েছে।

চীনের এই জলবিদ্যুৎ বাঁধটি বিশ্বের বৃহত্তম পরিকাঠামো প্রকল্প হিসেবে এরই মধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে কেন্দ্রটি প্রতি বছর ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিনহুয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মাধ্যমে ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

বাঁধ-বাঁধ খেলা
২০২০ সালে চীন যখন প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ওই বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনার ঘোষণা দেয়, এর অল্প কিছুদিন পরেই নয়াদিল্লি পাল্টা বাঁধ নির্মাণের কথা ভাবতে শুরু করে। এ নিয়ে গত ২৫ জানুয়ারি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে আল জাজিরা। এতে বলা হয়, চীনের বাঁধ প্রকল্পগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে অরুণাচলে সিয়াং নদীতে পাল্টা বাঁধের প্রস্তাব উঠেছে। তবে বিশেষজ্ঞ এবং জলবায়ু আন্দোলনকারীরা সতর্ক করে দিয়ে তখন বলেন, হিমালয় অঞ্চলের দুর্বল পরিবেশ এবং অতীতের ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প ও বন্যার ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে — দুটি বিশাল বাঁধের উপস্থিতি ওই অঞ্চলে এবং আশপাশের কয়েক লাখ মানুষের বসবাসে হুমকি তৈরি করবে।

নয়াদিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাহেলি চট্টরাজের মতে, চীন এই বাঁধকে একটি কৌশলগত উপাদান হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ পাবে। যেটির মাধ্যমে বিশেষ পরিস্থিতিতে পানির প্রবাহও নিয়ন্ত্রিত হতে পারে।

বাংলাদেশ কতটা ভুগবে
ব্রহ্মপুত্রের পানি নিয়ে ভারত ও চীন যখন টানাটানির খেলায় লিপ্ত, তখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের কয়েক কোটি মানুষের ওপর। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার মাত্র ৮ শতাংশ বাংলাদেশের ভেতরে পড়েছে। তবুও এই নদী প্রতিবছর বাংলাদেশের মোট পানির ৬৫ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করে। পানি-সম্পদকেন্দ্রিক নাগরিক সংগঠন ‘রিভারাইন পিপল’ এর মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, চীন, ভারতের ‘বাঁধের বিপরীতে বাঁধ’ প্রতিযোগিতার সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব বাংলাদেশের ওপরই পড়বে।

আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা খান বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদ বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পলিমাটি ডেল্টা তৈরি করে, এরপর তা বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়। যদি পলিপ্রবাহে কোনো অসামঞ্জস্য দেখা দেয়, তাহলে নদীভাঙন অনেক বেশি বেড়ে যাবে এবং নতুন জমি সৃষ্টি বা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।

ভূ-রাজনৈতিক শক্তির অপর নাম পানি
আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোকে প্রায়ই জাতিরাষ্ট্রগুলো ‘নল’ বা ‘ট্যাপ’ এর সঙ্গে তুলনা করে। যেগুলো বাঁধ বা জলবিদ্যুতের প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে খোলা বা বন্ধ করা যায়। ভারতীয় দৈনিক দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে (৬ জানুয়ারি ২০২৫) বলা হয়েছে, নদীগুলোর ওপর নির্মিত বিশাল বাঁধকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ কারণে ভূ-রাজনীতিতে ‘জলযুদ্ধ’, ‘জলবোমা’র মতো শব্দগুলোর ব্যবহার বেড়েছে। মূলত, এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় চীনের ভৌগলিক অবস্থান উঁচুতে হওয়ায় তিব্বতের নদীগুলোর ওপর দেশটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে। বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম নদী ইয়াংসির ওপরের বাঁধটিকে চীন এরই মধ্যে তাদের রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে।

বদলে যায় বর্ষাকাল
জলবায়ুর ওপর এশিয়ার পার্বত্যভূমির নদীগুলোর প্রভাব নিয়ে সম্প্রতি একটি বই লিখেছেন অস্ট্রেলিয়ার কয়েকজন গবেষক। ‘রিভারস অব দ্য এশিয়ান হাইল্যান্ডস: ফ্রম ডিপ টাইম টু দ্য ক্লাইমেট ক্রাইসিস’ শিরোনামের বইয়ের বরাত দিয়ে দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিব্বতের নদী ব্যবস্থাকে পৃথিবীর বরফমণ্ডলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। এ ছাড়া চীন শাসিত এই অঞ্চলের নদীগুলো পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু ব্যবস্থার অংশ, যা বর্ষা ও বৃষ্টিপাতের গতিপথসহ বৈশ্বিক জলবায়ু প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular