ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসারাদেশঢাকারাস্তায় নয়, সংসদেই রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে হবে — মির্জা ফখরুল

রাস্তায় নয়, সংসদেই রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে হবে — মির্জা ফখরুল

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশের রাজনীতি এখন রাস্তায় নয়, সংসদেই ফিরিয়ে আনতে হবে। সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতি ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্ব নিয়ে সংসদকে শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, আজকের শ্রমিক আন্দোলন তার পুরোনো ঐতিহ্য ও চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবে শ্রমিকদের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে, ফলে ট্রেড ইউনিয়নগুলো আগের মতো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছে না।

শনিবার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর পানি ভবনে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সভা ও সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব।

মির্জা ফখরুল বলেন, “আমার কাছে মনে হয়, সামগ্রিকভাবে গোটা পৃথিবীতে শ্রমিক, কর্মচারী এবং মালিকদের মধ্যে যে সম্পর্ক, সে সম্পর্কে গুণগত পরিবর্তন হয়েছে। উৎপাদনের গুণগত পরিবর্তন হয়েছে, সব মিলিয়ে বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের ফলে আজকে শ্রমিকরা ক্রমশই তাদের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। সেই কারণেই শ্রমিক আন্দোলন তার গুরুত্ব হারাচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, ট্রেড ইউনিয়ন আগে যেমন শ্রমিকদের স্বার্থে জোরালো ভূমিকা রাখতো, এখন আর সেভাবে কাজ করতে পারে না বা করে না। তার মতে, এটি শুধু বাংলাদেশের নয়—বিশ্বজুড়ে শ্রমিক রাজনীতির একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ফল।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে বেশিরভাগ শ্রমিক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। যেটা আমি মনে করি শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে খুব একটা সুফল দেয় না। যে ইস্যুগুলো নিয়ে আপনারা বার্গেন করেন, সরকারি দল পরিবর্তন হলেই ইউনিয়নগুলোর নেতৃত্বও বদলে যায়। সবাই সরকারি দলের সমর্থক হয়ে যায়। আবার সরকার পরিবর্তন হলে সেটাও বদলে যায়।”

তার মতে, এই রাজনৈতিক প্রভাব শ্রমিক সংগঠনের স্বতন্ত্রতা ও শক্তি ক্ষয় করছে, যা শ্রমিকদের প্রকৃত দাবিদাওয়া আদায়ে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, “আমাদের জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করেছে। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থে আন্দোলন এখন অনেক কম দেখা যায়। এই সময়টাতে ভৌগলিকভাবে চিন্তা করা দরকার—শ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে কীভাবে আরও বেশি করে শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা যায় এবং শ্রমিকদের গুণগত পরিবর্তন আনা যায়।”

তিনি বলেন, “আমরা আমাদের প্রাক্তন নেতাদের অনেককে দেখেছি—যেমন কাজী জাফর আহমেদ, মোজাফফর আহমেদসহ অনেক জ্ঞানী ও গুণী মানুষ শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে তারা মন্ত্রী হয়েছেন, বড় দায়িত্ব পেয়েছেন। আমরা তাদের জন্য গর্ব করতে পারি। তারা শ্রমিক শ্রেণীর মানুষের জন্য আন্দোলন করেছেন, তাদের দাবিগুলো আদায় করেছেন এবং জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।”

জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ৩৬ দফা দাবি প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে সমস্ত শ্রমিক দাবির সঙ্গে একমত। কারণ আমি বিশ্বাস করি, শ্রমিকদের ঘামের উপর এই সভ্যতা গড়ে উঠেছে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি অবশ্যই দিতে হবে। আমি এবং আমার দল আপনাদের এই আন্দোলনের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে চাই।”

তিনি বলেন, শ্রমিকদের দাবিগুলো নিয়ে সারাদিন আলোচনা হওয়া উচিত। একই সঙ্গে সংগঠনগুলোকে কীভাবে আরও আন্দোলনমুখী করা যায় এবং জনকল্যাণমূলক ইস্যুতে কাজ করা যায়—সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

নিজের রাজনৈতিক জীবনের শুরুর স্মৃতিচারণ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন,“আপনাদের পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘকালের। আমি ঠাকুরগাঁওয়ে অনেক শ্রমিক ইউনিয়নের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছি। তৎকালীন জাতীয় পার্টির সরকারের সময় আমাদের এলাকায় পানির সমস্যা ছিল, পানি উন্নয়ন বোর্ড সেখানে জড়িত ছিল। তখন আমরা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিলাম।”

তিনি জানান, “ঠাকুরগাঁওয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি গভীর নলকূপ প্রকল্প আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তর করে বহুমুখী প্রকল্পে রূপ দিই। এখন সেটি অত্যন্ত ভালোভাবে চলছে। এছাড়াও জিকে প্রজেক্ট, তিস্তা প্রজেক্ট—এসব গুরুত্বপূর্ণ পানি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।”

পানি সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পানি সংরক্ষণ করা। ভূগর্ভস্থ পানি ক্রমশ কমে যাচ্ছে। যদি আমরা পানি সংরক্ষণ করতে পারি, তাহলে সেই পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।”

তিনি আরও স্মরণ করেন, “আমাদের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচি দিয়ে শুরু করেছিলেন। তার ইনোভেটিভ চিন্তাভাবনা ছিল—যদি আমরা দেশের খালগুলো পুনরুদ্ধার করতে পারি, তাহলে পানির সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে। আগামীতে পানি উন্নয়ন বোর্ড এসব প্রকল্প নিলে তা অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।”

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “আমরা বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল মিলে একটি ঐতিহাসিক জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য ঘটনা—রাষ্ট্র কাঠামো পরিবর্তন, মূলনীতির সংশোধন এবং রাজনীতিকে জনগণের কাছে আরও স্বচ্ছভাবে পৌঁছে দেওয়া, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা এই সনদে প্রতিফলিত হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “প্রায় সাত-আট মাসের কাজ শেষে এই সনদ এসেছে। কিন্তু গতকাল একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে—জুলাই যোদ্ধাদের একটি গ্রুপ এসে বসে যায়। এরপর পুলিশ ও ছাত্রদের মধ্যে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এই ধরনের ঘটনা গণতন্ত্রকে সাহায্য করবে না। সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।”

বিএনপি মহাসচিব বলেন, “এই ইন্টেরিম সরকার এখন পর্যন্ত যতগুলো কাজ করেছে, তারা ভালো কাজ করার চেষ্টা করছে। আমরা যতই বলি না কেন, আওয়ামী লীগ গত ১৫ বছরে যে জঞ্জাল সৃষ্টি করেছে, তা এক বছরের মধ্যে পরিষ্কার করা সম্ভব নয়।”

তিনি আরও বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্ব নিয়ে, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে পার্লামেন্টকে শক্তিশালী করতে হবে। সমস্ত কর্মকাণ্ডকে পার্লামেন্টকেন্দ্রিক করতে হবে। না হলে সংসদীয় গণতন্ত্র কাজ করবে না।”

তার মতে, “পৃথিবীর যেসব দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র সফল হয়েছে, সেসব দেশে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু সংসদই। আমাদেরও রাস্তাঘাট থেকে উঠে সংসদে ফিরতে হবে। পঞ্চাশ বছর ধরে আমরা রাস্তায় আছি—এখন সময় এসেছে গণতন্ত্রকে একটি সংস্কৃতিতে রূপ দেওয়ার।”

সবশেষে মির্জা ফখরুল বলেন, “আমরা সবসময়ই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে বিশ্বাসী। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি একজন শ্রমিক’। আমরা সেই ভাবনা থেকেই সবসময় শ্রমিকদের পাশে আছি।”

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular