ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeজাতীয়ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক

ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক

নিউজ ডেস্ক: দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী, দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী করতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন। 

একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও উদ্যোক্তা দক্ষতা বিকাশে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সোমবার (৮ জুন) সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

মাহদী আমিন বলেন, ‘বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু সনদ নির্ভর না হয়ে বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে।’

এ সময় শিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন অধিদপ্তরের প্রধান এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য উপস্থিত ছিলেন।

মাহদী আমিন বলেন, ‘বর্তমান সরকার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, মেধা, মননশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার বিকাশ ঘটবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা চাই শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, নেতৃত্ব, প্রযুক্তি ও কর্মদক্ষতায়ও সমানভাবে এগিয়ে যাক।’ 

শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের অংশ হিসেবে নতুন পাঠ্যক্রমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রীড়া শিক্ষা, সংস্কৃতি শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে একটি নতুন বিষয়। এই বিষয়গুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ, নাগরিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক আচরণ ও বাস্তব জীবনের দক্ষতা গড়ে তোলা হবে।

মাহদী আমিন বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্রীড়া বিষয়টি নতুন সাবজেক্ট হিসেবে চালু করা হবে। সংস্কৃতি বিষয়টিও পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সকল শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে। পাশাপাশি ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে একটি বিষয় থাকবে, যেখানে নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দায়িত্বশীলতা এবং একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার বিষয়গুলো শেখানো হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিদ্যমান শিক্ষাকাঠামোর মধ্যেই একটি বিস্তৃত অধ্যায়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা হবে।’

শিক্ষা উপদেষ্টা জানান, দীর্ঘ ১৬ বছরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এসব সমস্যা একদিনে কিংবা এক বছরে সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সরকার ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে কাজ করছে।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষা ব্যবস্থার যেসব জায়গায় সংযোজন, বিয়োজন ও পরিমার্জন প্রয়োজন, আমরা তা বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের মতামতের ভিত্তিতে করব। আমাদের লক্ষ্য হলো এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ, দক্ষতা ও শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ থাকবে।’

নতুন কারিকুলাম প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, ‘সম্পূর্ণ নতুন পাঠ্যক্রম চালু করা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন বই প্রণয়ন ও ছাপানোর জন্য সরকারের হাতে মাত্র তিন থেকে চার মাস সময় ছিল। ফলে সব পরিবর্তন একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তবে চলমান সংস্কার কার্যক্রম আগামী বছর আরও বিস্তৃত হবে।’

তনি আরও বলেন, ‘আমরা বাস্তবতাকে মাথায় রেখে কাজ করছি। তিন-চার মাসে শতভাগ পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবে আগামী বছর আরও ব্যাপক পরিবর্তন আনা হবে এবং ধীরে ধীরে একটি আধুনিক, দক্ষতাভিত্তিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা খাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি জানান, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য বিপুলসংখ্যক ট্যাব সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমাদের প্রায় ১৪ লাখ ট্যাব প্রয়োজন হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি বড় প্রকল্প। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ বিষয়ে পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’

মাহদী আমিন দেশের শিক্ষার্থীদের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক বিকাশে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে এ বছর ২২ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। বালক ও বালিকা মিলিয়ে এই অংশগ্রহণ দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে একটি বড় অর্জন।

তিনি বলেন, ‘ফুটবল টুর্নামেন্টের মাধ্যমে আমরা শিশুদের মধ্যে শৃঙ্খলা, দলগত কাজ, নেতৃত্ব এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে চাই। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিযোগিতা চলছে। আগামী ২০ জুন জাতীয় পর্যায়ের ফাইনাল আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।’

শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা বিকাশে ‘স্টার্ট-আপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং’ নামে একটি জাতীয় কর্মসূচি চালুর কথাও জানান তিনি। এ কর্মসূচির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা স্থানীয় ও জাতীয় সমস্যার সমাধানে উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপনের সুযোগ পাবে।

তিনি আরও বলেন, ‘যেসব শিক্ষার্থী ভালো উদ্ভাবনী ধারণা নিয়ে আসবে, তাদের জন্য সিড ফান্ডিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। আমরা চাই তরুণরা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠুক এবং দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখুক।’

কারিগরি শিক্ষার প্রসার নিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশে কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হবে। এ লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে স্কিলস কম্পিটিশন, ক্যারিয়ার ফেয়ার এবং সরাসরি চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।’

তার ভাষায়, ‘আমরা চাই কারিগরি শিক্ষা একটি সম্মানজনক শিক্ষাধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই যেন শিক্ষার্থীরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, সেই ব্যবস্থা তৈরি করা হবে।’

এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণে ‘ওয়ান স্টুডেন্ট, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে একটি করে গাছের চারা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এই উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা হবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular