ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeঅর্থনীতিহিমাগারে আলু রেখে বিপাকে কৃষক-ব্যবসায়ী

হিমাগারে আলু রেখে বিপাকে কৃষক-ব্যবসায়ী

অর্থনীতি ডেস্ক: হিমাগারে আলু সংরক্ষণে রেখে এখন কেজি প্রতি ৬ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষক ও ব্যবসায়ীদের। ভালো দামে আলু বিক্রির আশায় হিমাগারে আলু রেখে বিপাকে তারা।

হিমাগার ভাড়া, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুর দাম পড়ছে ২০ টাকা। অথচ সেই আলু বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৪ টাকা দরে। এতে কেজিতে ৬ টাকা লোকসান গুনছেন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা।

আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, আলুর মৌসুমে তারা মাঠ থেকে ১০-১২ টাকা কেজি দরে আলু কেনাবেচা করেছেন। আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করলে পরে ভালো দাম পাবেন, এমন আশায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেন।

কিন্তু বর্তমানে বাজারে চাহিদা কম থাকায় প্রত্যাশিত দামে আলু বিক্রি করতে পারছেন না তারা। আর কিছুদিন পরই আবার নতুন আলু ওঠা শুরু হবে, এ পরিস্থিতিতে হিমাগারে পড়ে থাকা আলু নিয়ে লোকসানের শঙ্কা বাড়ছে বলে জানান তারা।

ঠাকুরগাঁওয়ের সদর উপজেলার শিবগঞ্জ এলাকার আলুচাষি মোজাফফর হোসেন বলেন, আলুর দাম কম থাকায় তিনি হিমাগারে আলু রেখেছিলেন। পরে দাম বাড়লে হিমাগার থেকে আলু তুলে বিক্রি করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু হিমাগার ভাড়া ও অন্যান্য খরচ সব মিলিয়ে এখন প্রতি কেজি আলুর দাম পড়েছে ২০ টাকা। আবার সেই আলু বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে ১৪ টাকা কেজি দরে। এতে কেজিপ্রতি ৬ টাকা করে লোকসান হচ্ছে তার।

রানীশংকৈল উপজেলার কৃষক ফারুক আহাম্মেদ জানান, গত দুই-তিন মৌসুম ধরে আলু চাষ ও হিমাগারে সংরক্ষণ করে লোকসানের মুখে পড়েছেন। এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে তার পুঁজি হারিয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকরা আলু চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। আলুর দাম সামঞ্জস্য রাখতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার পটুয়া এলাকার আলু ব্যবসায়ী সামসুজ্জোহা বলেন, এই সময়ে হিমাগার থেকে প্রচুর আলু বাজারে আসার কথা। কিন্তু বাজারে চাহিদা কম থাকায় সেভাবে আলু আসছে না। তার দাবি, এখনো প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আলু হিমাগারে পড়ে আছে। দ্রুত বাজারজাত করা না গেলে লোকসান আরও বাড়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ঠাকুরগাঁওয়ে ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে আগাম জাতের আলু চাষ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে।

জেলায় আলু সংরক্ষণের জন্য রয়েছে ১৯টি হিমাগার। এসব হিমাগারে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন আলু মজুত রয়েছে। বাজারে চাহিদা কম থাকায় ধীরগতিতে আলু বের হচ্ছে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি হিমাগার মালিকরাও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

শাহী হিমাগারের ব্যবস্থাপক আল আমিন বলেন, আলুর দাম কম থাকায় হিমাগার থেকে আলু বের হচ্ছে না। হিমাগার থেকে আলু বের না হলে কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিক সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

আলুর বাজারে মন্দার প্রভাব পড়েছে হিমাগারের শ্রমিকদের ওপরও। শ্রমিকরা জানান, আলু ওঠানো ও নামানোর কাজ কমে যাওয়ায় তাদের আয়ও কমেছে।

জেলা কোল্ড স্টোর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আরমান হোসেন বলেন, ‘যেই বর্ধিত আলুটা হিমাগারে জমা পড়ে আছে সেটা যদি আমরা বের করতে না পারি তাহলে আলু যে একটা শিল্প হিসেবে তৈরি হয়েছিল ঠাকুরগাঁও জেলায়-এই শিল্প ধ্বংসে পরিণত হবে।

এতে করে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে হিমাগার মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ব্যবসায়ীরাও। পুরো সেক্টরই একটা হুমকির মুখে পড়বে।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো. আলমগীর কবির বলেন, কৃষকরা লাভের আশায় আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। বর্তমানে আগের তুলনায় দাম অনেক কম থাকায় তারা লোকসানের মুখে পড়েছেন।

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, লোকসান কমাতে দ্রুত আলু বাজারজাতের পাশাপাশি রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এতে হিমাগারে পড়ে থাকা আলু দ্রুত বিক্রির সুযোগ তৈরি হবে এবং কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতি কিছুটা হলেও কমবে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে প্রতিবছর আলুর মোট চাহিদা প্রায় ৭৫ থেকে ৯০ লাখ টন। এর মধ্যে মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য হিসেবে ব্যবহার এবং পরবর্তী মৌসুমের জন্য বীজ হিসেবে রাখার জন্য মূলত ৮০ লাখ টন আলুর প্রয়োজন হয়।

বিপরীতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী দেশে আলুর উৎপাদন চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি, যা বছরে প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ থেকে ১ কোটি ১৫ লাখ টনে পৌঁছায়। চাহিদার অতিরিক্ত এই আলু কোল্ড স্টোরেজে রাখা হয় এবং বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের হিমাগারগুলোতে আনুমানিক ৩৫ লাখ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষিত আছে। দেশের প্রায় ৩৫০টি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা ৬০ লাখ মেট্রিক টন, যার মধ্যে প্রায় ৫৮.৩ শতাংশ অংশ আলু দিয়ে পূর্ণ রয়েছে।

এর মধ্যে আলু উৎপাদনকারী প্রধান বগুড়া জেলার ৫১টি হিমাগারে প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার ৩৪২ মেট্রিক টন খাবার ও বীজ আলু সংরক্ষিত রয়েছে, যার একটি বড় অংশ সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে খালাস করা হয়েছে। অন্যদিকে ঠাকুরগাঁও জেলার ১৭টি হিমাগারের মোট আলু সংরক্ষণ ক্ষমতা ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫৩২ মেট্রিক টন এবং রংপুর অঞ্চলের হিমাগারগুলোয় মোট আলুর ধারণক্ষমতা ১১ লাখ ২৯ হাজার ৩৫ মেট্রিক টন।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular