ঢাকা  বৃহস্পতিবার, ১১ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৫শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeখোলা কলামআস্থার সংকটে চিকিৎসা ব্যবস্থা

আস্থার সংকটে চিকিৎসা ব্যবস্থা

প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত আজ এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো, যেগুলো সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা, সেগুলোই আজ নানা বিতর্ক, অব্যবস্থাপনা, অনাস্থা, সহিংসতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে রোগীর স্বজনদের ক্ষোভ, অন্যদিকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তাহীনতা—এই দুইয়ের সংঘাতে সমগ্র চিকিৎসা ব্যবস্থা ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।
 
উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। কোথাও রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসকদের ওপর হামলা হয়েছে, কোথাও হাসপাতালের ভেতরে ভাঙচুর চালানো হয়েছে, আবার কোথাও লাশ আটকে রেখে অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসক, রোগী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি বিপজ্জনক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।
 
বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্প্রতি মর্গে লাশ আটকে রেখে অর্থ দাবির অভিযোগকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজনদের বিক্ষোভের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাশবাহী গাড়ি আটকে দিয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অবস্থান কর্মসূচি স্বাস্থ্যসেবার স্বাভাবিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। রাজধানীর আদ- দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের ঘটনাও স্বাস্থ্যখাতে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এই সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতামত উঠে এসেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে।
 
চিকিৎসক সমাজ সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য
এরই মধ্যে কিছু গণমাধ্যম ও টকশোতে চিকিৎসক সমাজ সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। কোনো ব্যক্তি বা পেশাজীবী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামগ্রিকভাবে অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে, কিন্তু তা হতে হবে তথ্যভিত্তিক, শালীন এবং দায়িত্বশীল।
 
বাস্তবতা
বাস্তবতা হলো, চিকিৎসা একটি অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। পৃথিবীর কোনো দেশেই শতভাগ রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব নয়। রোগীর শারীরিক অবস্থা, রোগের ধরন, চিকিৎসা গ্রহণের সময়, হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা এবং অনেক অনিবার্য বিষয় চিকিৎসার ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই প্রতিটি মৃত্যু চিকিৎসকের অবহেলার ফল—এমন ধারণা যেমন ভুল, তেমনি চিকিৎসা ব্যবস্থার সকল ত্রুটি অস্বীকার করাও বাস্তবসম্মত নয়।
 
আমাদের স্বীকার করতে হবে যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে এখনও অনেক সমস্যা বিদ্যমান। সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ অত্যধিক, চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম, আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে, প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান না করে শুধুমাত্র চিকিৎসকদের দোষারোপ করলে প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়াল হয়ে যাবে।
 
নিজের হাতে আইন
একইভাবে রোগীর স্বজনদেরও বুঝতে হবে যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার করার জন্য হাসপাতাল প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC), ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং দেশের বিচারব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু অভিযোগের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই হামলা, ভাঙচুর বা মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সমাজকে আরও অরাজকতার দিকে ঠেলে দেয়।
 
চিকিৎসক-রোগী আস্থার সম্পর্ক কাম্য
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসক-রোগী আস্থার সম্পর্ককে অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যখন এই আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, তখন পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশে সেই আস্থার সংকট স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
 
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনা বাড়তে থাকলে তরুণ চিকিৎসকদের মধ্যে ভয় ও হতাশা তৈরি হবে। অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ বিভাগে কাজ করতে অনাগ্রহী হবেন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষই। একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, প্রশাসন এবং রোগী—সবার সম্মিলিত সহযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এখানে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
 
পরিস্থিতি উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ জরুরি।
প্রথমত, হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
দ্বিতীয়ত, রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত এবং নিষ্পত্তির জন্য প্রতিটি হাসপাতালে কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেল গঠন করতে হবে।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবহেলার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। প্রকৃত অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
চতুর্থত, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। তথ্য যাচাই ছাড়া উত্তেজনাকর প্রচারণা সামাজিক অস্থিরতা বাড়ায়।
পঞ্চমত, চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতে হবে। অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝি থেকেই বড় সংঘাতের সৃষ্টি হয়।
ষষ্ঠত, স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, যাতে জনবল বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।
 
আজ বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোকে ঘিরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা কেবল চিকিৎসকদের সংকট নয়; এটি সমগ্র জাতির সংকট। কারণ একজন রোগী যখন অসুস্থ হন, তখন তার একমাত্র ভরসা হাসপাতাল। সেই হাসপাতাল যদি সংঘাত, অবিশ্বাস ও সহিংসতার কেন্দ্রে পরিণত হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হবে সাধারণ জনগণ।
 
অতএব, আমাদের এখন আবেগ নয়, প্রয়োজন যুক্তিবোধ; সংঘাত নয়, প্রয়োজন সংলাপ; প্রতিশোধ নয়, প্রয়োজন ন্যায়বিচার। চিকিৎসক, রোগী, প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র—সব পক্ষকে নিয়ে একটি আস্থাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় হাসপাতালগুলো ধীরে ধীরে চিকিৎসার কেন্দ্র নয়, বরং সংঘাতের ময়দানে পরিণত হবে—যার মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকে।
 
লেখক: শিক্ষাবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular