ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসারাদেশনান্দাইলে ভুয়া কাজিদের কব্জায় বিয়ে নিবন্ধন, হুমকিতে বর ও কনের ভবিষ্যৎ

নান্দাইলে ভুয়া কাজিদের কব্জায় বিয়ে নিবন্ধন, হুমকিতে বর ও কনের ভবিষ্যৎ

জালাল উদ্দিন মন্ডল নিজস্ব প্রতিবেদক:
ময়মনসিংহের উপজেলা নান্দাইলে বাড়ছে অনিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা ভুয়া কাজির সংখ্যা। সরকারি বিধিমালার তোয়াক্কা না করে শতাধিক ভুয়া কাজি উপজেলায় বিয়ে নিবন্ধনের নামে প্রতারণা করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ১৩ জন নিবন্ধিত কাজি থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছেন ১০ জন। উপজেলার চণ্ডীপাশা ইউনিয়নসহ তিনটি ইউনিয়নে প্রায় ২০ বছর ধরে নিবন্ধিত কাজি নেই।
এদিকে, নিবন্ধিত কাজি না থাকার সুযোগে উপজেলায় বাড়ছে ভুয়া কাজির দৌরাত্ম্য। ফলে বিয়ের আসরে সম্পন্ন হওয়া নিবন্ধন সরকারি খাতায় আদৌ অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে কি না, তা জানেন না অনেক বর-কনে ও তাঁদের অভিভাবকগণ ।
নান্দাইলের ১০ জন নিবন্ধিত কাজির মধ্যে মাত্র দুজন ছাড়া বাকি আটজনই কোনো না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে মাদরাসার সুপার ও অধ্যক্ষও রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা এসব প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা বা আর্থিক সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি কাজির দায়িত্বও পালন করছেন, যা আইনবহির্ভূত।
মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে লাভজনক পদে কর্মরত থাকলে তিনি কাজি হিসেবে লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য নন। এমনকি কাজি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলে তাঁর লাইসেন্স বাতিলযোগ্য।
উপজেলার বৈধ কাজিদের প্রত্যেকের অধীনে অন্তত ১০ জন করে মাঠপর্যায়ে ‘সাব-কাজি’ পরিচয়ে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা, আইনি ও ধর্মীয় জ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে ছাত্র।
‘সাব-কাজি’ পরিচয় দেওয়া আবুল খায়ের নামের এক ব্যক্তি বলেন, “কোনো কাজ না পেয়ে বাধ্য হয়ে মোটা অঙ্কের টাকা জমা দিয়ে একজন মূল কাজির কাছ থেকে একটি বই (ভলিউম) নিয়েছি। ওই বইয়ের জন্য প্রতি বিয়েতে মূল কাজিকে আদায়কৃত টাকার সিংহভাগ টাকা দিয়ে দিতে হয়।”

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী নির্ধারিত ফি উপেক্ষা করে বর-কনে বা তাঁদের পরিবারের কাছ থেকে ইচ্ছামতো টাকা আদায় করছেন এসব ‘সাব-কাজি’। আদায় করা ফির সিংহভাগই বৈধ কাজিদের পকেটে যাচ্ছে। সেখান থেকে সরকারি কোষাগারে কোনো অর্থ জমা হচ্ছে কি না, তা তদারকিরও কার্যকর ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
নান্দাইল উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নের কাজি আনোয়ার কাদিরের জানান, তাঁর ইউনিয়নেই অন্তত ১২ জন ভুয়া কাজি সক্রিয় রয়েছেন। আতিকুল্লাহ, শাহ আলম ও হেদায়েত উল্লাহ নামে তিনজনের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে অজ্ঞাত ব্যক্তির কাছ থেকে জাল বই বা ভলিউম সংগ্রহ করে এসব ভুয়া কাজি অবাধে বিয়ের কার্যক্রম সম্পন্ন করছেন।
এতে বৈধ কাজিরা যেমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন, তেমনি হুমকির মুখে পড়ছে বর-কনের ভবিষ্যৎ।

নান্দাইল পৌরসভার নিকাহ নিবন্ধক (কাজি) গোলাপ মওলা ‘সাব-কাজি’ বা সহকারী রাখার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “একদিনে একাধিক বিয়ে হলে একার পক্ষে সব সামলানো সম্ভব হয় না। তাই লোক রাখতে হয়। তবে বর্তমানে ভুয়া বই ছাপিয়ে ভুয়া কাজি সেজে অসংখ্য প্রতারক মাঠে নামায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে।”

অভিযোগ রয়েছে, বিয়ের আসরে হঠাৎ অজ্ঞাত বই নিয়ে হাজির হওয়া এসব ‘সাব-কাজি’ ও ভুয়া কাজির মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া বিয়ের নিবন্ধন অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি মূল ভলিউম বা ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত হয় না। ফলে বিয়ের পর দম্পতির মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে কাবিননামা যাচাই করতে গিয়ে সেটি জাল বলে জানা যায়।
কাবিননামা বৈধ না হলে নারীরা দেনমোহর ও ভরণপোষণের আইনি অধিকার আদায়ে জটিলতার মুখে পড়তে পারেন। অন্যদিকে পুরুষরাও প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী, সরকার নির্দিষ্ট এলাকার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ করে। সেই লাইসেন্স অন্য কাউকে ভাড়া দেওয়া বা সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়া আইনসম্মত নয়।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা রেজিস্ট্রার প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, “বৈধ কাজি ছাড়া অন্য কারও বিয়ে নিবন্ধন করার বিন্দুমাত্র আইনি ক্ষমতা নেই। ‘সাব-কাজি’ বলতে আইনের চোখে কোনো পদের অস্তিত্ব নেই। বিয়ে নিবন্ধনের ফিও সরকার নির্ধারিত।”
তিনি আরও বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ভুয়া কাজি ও অবৈধভাবে বিয়ে নিবন্ধনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অচিরেই কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরো খবর
Continue to the category
- Advertisment -spot_img

Most Popular