নিউজ ডেস্ক : ঢাকা, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ৩য় সমাবর্তন রবিবার সকালেই সেনানিবাসের কনভেনশন হলে আয়োজিত হয়, যেখানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণ ও সহনশীল নেতৃত্ব গড়ার জোরালো আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে মোট ৫,৯০৩ জন শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি প্রদান করা হয়; এদের মধ্যে ৫,২২৪ জন স্নাতক এবং ৬৭৯ জন স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী।
সমাবর্তন অনুষ্ঠান পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাগত বক্তব্যে গ্রাজুয়েটদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, আজকের ছাত্ররা কেবল একটি ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছে না, তারা দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্ত করে তোলার জন্য এই তরুণ প্রজন্মই দায়িত্বশীল ও কর্মঠ নেতৃত্ব গড়ে তুলবে।
প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, রাজনৈতিক বিভাজন ও সহনশীলতার অভাবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; এ সমস্যা থেকে উত্তরণে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও সহনশীল নেতৃত্ব গড়ে তোলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অপরিহার্য। তিনি ২০২৪ সালের তরুণ প্রজন্মের গণঅভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের পরিবর্তন নয় — প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার চাই, যাতে দেশের নাগরিকরা ন্যায়বিচার পায় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নিশ্চিত হয়। অনুষ্ঠানে তিনি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তরুণদের অংশগ্রহণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিনির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পরামর্শ দেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদানের আহ্বান জানান।
ফরিদা আখতার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেন; তিনি জানান, মাছ, ডিম, দুধ ও মাংস মানুষদের পুষ্টির প্রধান উৎস হলেও এসব পণ্যের অভাব প্রান্তিক খামারিদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট ও পরিবেশ দূষণের কারণে স্থানীয় মাছের অভাব বাড়ছে; তিনি উল্লেখ করেন যে সাম্প্রতিক জরিপে ২০১৮ সালের তুলনায় সমুদ্রে মাছের পরিমাণ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হ্রাস পেয়েছে — যা দেশের মৎস্যশিল্প ও উপভোক্তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ। তিনি দেশীয় গবাদি ও পোলট্রি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সরকারের নীতিগত উদ্যোগ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
স্বাস্থ্য বিষয়েও উপদেষ্টা শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য পরামর্শ দেন — ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য পরিহারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ধূমপান হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও স্ট্রোকসহ নানা অসংক্রামক রোগের প্রধান কারণ; আইন প্রয়োগের অপেক্ষা না করে আত্মনিয়ন্ত্রণ থেকেই নিজেদের ও সমাজকে রক্ষা করা জরুরি।
সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস. এম. এ. ফায়েজ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, সমাজ ও দেশ তাদের কাছ থেকে অনেক প্রত্যাশা রাখে; শিক্ষিত নাগরিক হিসেবে তাদের কর্তব্য হলো ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝা এবং দেশের উন্নয়নে অংশ নেওয়া। তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গতকালের গণঅভ্যুত্থানে অবদানের কথাও স্মরণ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কাজী জামিল আজহারের অনুপস্থিতিতে তার বক্তব্য পড়ে শোনান ট্রাস্টিজ সদস্য ডা. সাগুপ্তা মাহমুদ। উপাচার্য, ডিনরা, রেজিস্ট্রার এবং বিশ্ববিদ্যালয় উপদেষ্টাগণ উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদেরকে সফল ভবিষ্যৎ গঠনে উৎসাহ দেন। ডিগ্রি প্রদান অনুষ্ঠানে কনভোকেশন মার্শাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আনিকা হাবিব।
সমাবর্তনে সম্মানসূচক পদকগুলোর মধ্যে চ্যান্সেলর’স গোল্ড মেডেল জিতে নেন খলিলুর রহমান; কাজী আজহার আলী গোল্ড মেডেল পান নুসরাত কবির বৃষ্টি। ভাইস-চ্যান্সেলর’স গোল্ড মেডেলে নাম আসে শায়েকা লাওলাক, তাজিবা আফরিন ও তানিয়া আক্তারের। একাডেমিক উৎকর্ষের ভিত্তিতে ডিন’স অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য নাম রয়েছে — মৌমিতা ভৌমিক সুপ্তি, মোসা. জান্নাতি খাতুন, মো. তারিকুল ইসলাম, প্রিনন মাহদী, মো. মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ।
সমাবর্তনের আনুষ্ঠানিক অংশ শেষে বিকেলে আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে গ্রাজুয়েটরা নৃত্য ও সঙ্গীত পরিবেশের মাধ্যমে আনন্দ ভাগ করে নেন। অনুষ্ঠান সুষ্ঠু ও উজ্জ্বল পরিবেশে শেষ হয়; বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষকগণ ও অভিভাবকরা সমাবর্তনকে সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এই সমাবর্তন শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল একটি ডিগ্রি গ্রহণই নয় — এটি কর্তব্যবোধ, নেতৃত্বগঠন ও সামাজিক দায়িত্বের অঙ্গীকারবোধের সূচনা। দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব এখন তাদের হাতে; উপদেষ্টার আহ্বান অনুযায়ী তাদের দায়িত্বশীল, সহনশীল ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো একান্ত প্রয়োজন।




