স্বাস্থ্য ডেস্ক: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের গঠন ও রাসায়নিক উপাদানে স্বাভাবিক কিছু পরিবর্তন আসে। যা আমাদের চিন্তাভাবনা ও স্মৃতিশক্তির গতি কমিয়ে দিতে পারে।
তবে দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন আনলে ৭০ বছর বয়সেও ধারালো ও কার্যকর মস্তিষ্ক ধরে রাখা সম্ভব। মস্তিষ্ক সুস্থ রাখার মূল কাজগুলো প্রতিদিন বাইরে নিজের কাজ নিজেরই করতে হবে।
নিউরোসার্জনের ১০ টি টিপস:
১) পর্যাপ্ত ঘুম
ঘুম মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ বর্জ্য অপসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে। গভীর ঘুমের সময় মস্তিষ্কে পুনরুদ্ধারমূলক নানা কার্যক্রম চলে, যা শেখার ক্ষমতা ও জ্ঞানীয় কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করে। মস্তিষ্কের সর্বোত্তম স্বাস্থ্য বজায় রাখতে ড. নায়েক রাতে ৭-৮ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ও আরামদায়ক ঘুমের পরামর্শ দেন।
২) সূর্যালোক
প্রাকৃতিক সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসা শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এটি সরাসরি ঘুম ও জাগরণের চক্রকে প্রভাবিত করে এবং ঘুমের মান ভালো করতে পারে।
পাশাপাশি, সূর্যালোক ভিটামিন ডি তৈরিতে সহায়তা করে এবং সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়াতে পারে, যা মেজাজ, সতর্কতা ও জ্ঞানীয় প্রক্রিয়াকরণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ‘সকালের ১০ মিনিটের আলো আপনার মস্তিষ্কের ঘড়ি রাখে ভালো’।
৩) স্কোয়াট ব্যায়াম
“বয়স বাড়ার সাথে সাথে
পায়ের শক্তি রাখো ঠিক
তোমার মাথার তার ছিঁড়বে না আর
জেনে রেখো সুধীজন।”
স্কোয়াটের মতো ব্যায়ামে শরীরের নিচের অংশের বড় পেশিগুলো সক্রিয় হয়, যা রক্তসঞ্চালন বাড়াতে সহায়তা করে। এর ফলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্তপ্রবাহ বাড়তে পারে এবং বিভিন্ন গ্রোথ ফ্যাক্টর নিঃসরণে সহায়তা করতে পারে।
এগুলো মস্তিষ্কের কোষের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে এবং নতুন স্নায়ুকোষ তৈরির প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে স্কোয়াট পেশিশক্তি ও সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতেও কার্যকর।
৪) শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম
রেজিস্ট্যান্স বা শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম জ্ঞানীয় কার্যকারিতা বাড়াতে এবং বয়সজনিত জ্ঞানীয় অবক্ষয়ের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
নিয়মিত শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম পেশিশক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি রক্তসঞ্চালন ও বিভিন্ন উপকারী গ্রোথ ফ্যাক্টরের নিঃসরণে সহায়তা করতে পারে, যা স্নায়ুকোষের স্বাস্থ্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
৫) সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারে সতর্কতা
কিছু নির্দিষ্ট সাপ্লিমেন্ট- যেমন ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, বি-ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ও স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের কোষের গঠন ও কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ‘আপনার যে উপাদানটির ঘাটতি রয়েছে, কেবল সেটিরই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত। আগে পরীক্ষা করে নিন- বেশি গ্রহণ করা ভালো নয়।’
৬) সামাজিক মেলামেশা
নিয়মিত ও অর্থপূর্ণ সামাজিক মেলামেশা মস্তিষ্কের একাধিক অঞ্চলকে সক্রিয় রাখে এবং এক ধরনের মানসিক ব্যায়াম হিসেবে কাজ করে।
‘একাকীত্ব মস্তিষ্কের দ্রুত সংকোচন ঘটায়। দিনে একবার আন্তরিক কথোপকথনও ওষুধের মতো কাজ করতে পারে।’
সামাজিকভাবে সংযুক্ত থাকা দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে। এই দুটিই জ্ঞানীয় অবক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৭) নতুন দক্ষতা অর্জন
নিয়মিত নতুন দক্ষতা বা শখ অর্জন মস্তিষ্ককে সক্রিয় ও চ্যালেঞ্জের মধ্যে রাখে এবং মস্তিষ্কের অভিযোজনক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
বাদ্যযন্ত্র বাজানো, নতুন ভাষা শেখা কিংবা অন্য কোনো মানসিকভাবে উদ্দীপক কাজে যুক্ত থাকা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানীয় সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
৮) মুহূর্তকে উপভোগ করা
মননশীলতার চর্চা এবং বর্তমান মুহূর্তকে সচেতনভাবে উপভোগ করা আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে।
মনোযোগ দিয়ে খাবার খাওয়া কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো ছোট ছোট অভ্যাস সামগ্রিক মানসিক সুস্থতা ও জ্ঞানীয় কার্যকারিতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
‘একটি ভালো মুহূর্তে ২০ সেকেন্ডের জন্য থামুন। কৃতজ্ঞতা আপনার মস্তিষ্কের হুমকি-প্রতিরোধী ফিল্টারকে নতুনভাবে সাজিয়ে দেয়।’
৯) মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং স্মৃতিশক্তি ও জ্ঞানীয় সক্ষমতা ব্যাহত করতে পারে।
তাই মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন, যোগব্যায়াম কিংবা গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো কৌশল চর্চা করা যেতে পারে। এসব অভ্যাস মানসিক চাপ কমাতে এবং সামগ্রিকভাবে মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
১০) নীরবতা পালন
মস্তিষ্কের জন্য ‘১০ মিনিটের নীরবতা বা ধ্যান’ অত্যন্ত উপকারী। প্রতিদিন কিছুটা সময় আত্মচিন্তা ও স্থিরতার জন্য রাখলে মনোযোগ ও মানসিক স্বচ্ছতা বাড়তে পারে।
ধ্যান করা বা কিছুটা সময় নীরবে কাটানো মানসিক জঞ্জাল কমাতে, আত্মসচেতনতা বাড়াতে এবং প্রশান্তির অনুভূতি তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।
এর ফলে সামগ্রিক মানসিক ও জ্ঞানীয় সুস্থতাও উপকৃত হতে পারে।



