ঢাকা  বৃহস্পতিবার, ১১ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৫শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeরাজনীতিকমরেড মণি সিংহের ৩৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত

কমরেড মণি সিংহের ৩৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত

নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি, মুজিবনগর সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা, উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা কমরেড মণি সিংহ ১৯৯০ সালের এইদিনে মৃত্যুবরণ করেন।

আজ পোস্তগোলাস্থ কমরেড মণি সিংহের স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রিয় কমিটি, ঢাকা দক্ষিণ, সূত্রাপুর থানা, কদমতলী থানা, দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন কেন্দ্রিয় কমিটি, সূত্রাপুর থানা কমিটি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রিয় কমিটি ও ঢাকা মহানগর কমিটি, সিপিবি ৪৫-৪৬ নং ওয়ার্ড শাখা ও ৪৩ নং ওয়ার্ড শাখা।

শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পনের পর সূত্রাপুর থানা কমিটির সভাপতি কমরেড বিকাশ সাহার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড গোলাম রাব্বী খানের সঞ্চালনায় স্মরণসভায় বক্তব্য রাখেন সিপিবি কেন্দ্রিয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক জননেতা কমরেড রুহিন হোসেন প্রিন্স, সহকারি সাধারণ সম্পাদক কমরেড মিহির ঘোষ, বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হোসেন খান, ডিএসকে’র পরিচালক ও সাবেক ছাত্রনেতা সামসুল আলম, সিপিবি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নেতা সাইফুল ইসলাম সমীর, সূত্রাপুর থানা কমিটির সরকারি সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন প্রমুখ।

বক্তারা বলেন, কমরেড মণি সিংহ রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হন। কলকাতার মেটিয়া বুরুজে চটকল শ্রমিকদের প্রিয় নেতা ছিলেন তিনি। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলায় কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলেন। টংক আন্দোলন ও তেভাগা আন্দোলনের তিনি ছিলেন রূপকার। তাঁর নেতৃত্বে টংক আন্দোলন এত ব্যাপকতা লাভ করে যে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার আন্দোলনের কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য হয় এবং টংক প্রথা বিলুপ্ত হয়। ময়মনসিংহ অঞ্চলে যে বিশাল তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত হয়—তারও মধ্যমণি ছিলেন তিনি।

মণি সিংহ জন্মেছিলেন কলকাতা শহরে ১৯০০ সালে। তাঁর বাবা কালি কুমার সিংহ ছিলেন নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলার জমিদার পুত্র আর মা সুসং দুর্গাপুর রাজপরিবারের মেয়ে। রাজ পরিবারে জন্মেও মণি সিংহ সমাজের বিপ্লবী পরিবর্তনের লক্ষ্যে উৎসর্গ করেন নিজেকে। বিদ্রোহ করেন নিজ পরিবারের শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে। প্রজাসাধারণকে সংগঠিত করে গড়ে তোলেন কৃষক আন্দোলন। কমরেড মণি সিংহ কলতায় স্কুল ছাত্রাবস্থায়ই বিপ্লবীদের সংস্পর্শে আসেন। জড়িয়ে পড়েন ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামে। গোপন অনুশীলন দলে যোগ দিয়ে ব্রিটিশ বিতাড়নের সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হন। ১৯২১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। আত্মগোপন অবস্থায় দীক্ষা নেন সাম্যবাদী আদর্শের। ১৯২৫ সালে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সূচনাপর্বেই যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিতে।

তিনি সব সময় বলতেন, সমবেত উন্নত জীবন না হলে উন্নত সমাজ হয় না। দেশপ্রেমের অর্থ হলো দেশের সব মানুষের খাবার-কাপড়-ঘর, চিকিৎসা-শিক্ষা এবং মন খুলে কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করা।

পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন কমরেড মণি সিংহ। পাকিস্তানি শাসনের প্রায় পুরো সময়েই কমিউনিস্ট পার্টি ছিল নিষিদ্ধ। কমিউনিস্ট নেতারা হয় কারাগারে, নয় আত্মগোপনে থাকতেন। আটচল্লিশের ভুখা-মিছিল, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, টংক, নানকার তেভাগাসহ বিভিন্ন কৃষক আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টি এবং মণি সিংহের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল। চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের মণি সিংহের নেতৃত্বে বাম কমিউনিস্টদের ভূমিকা ছিল কার্যকর ও সার্থক। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ষাটের দশকজুড়ে যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন পরিচালিত হতো সেখানে মণি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্টরা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
আত্মগোপন অবস্থায় মণি সিংহ ছাত্র-আন্দোলনের নানা বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে আন্দোলনকে সজীব রেখেছেন। ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টি ষাটের দশকে নানা সংগ্রামের পটভূমিতে, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৬৭ সালে আত্মগোপন অবস্থায় কমরেড মণি সিংহ গ্রেপ্তার হন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যূত্থানের ফলে পাকিস্তানি সরকার অন্য রাজবন্দীদের সঙ্গে তাঁকেও মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু এ বছরই মার্চ মাসে ইয়াহিয়ার সামরিক শাসন জারি হলে আবার তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রাজশাহীর ছাত্রজনতা রাজশাহীর কারাগার ভেঙে তাঁকে মুক্ত করে। এরপর তিনি মুক্তিযুদ্ধে আত্মনিয়োগ করেন। ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনী গঠন করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে মণি সিংহ ও তাঁর সহকর্মীরা বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বসহ আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভূমিকা পালনে মণি সিংহ ও তাঁর পার্টি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য।

কমরেড মণি সিংহ রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রামে যেমন জীবন্ত এবং অগ্রণী ছিলেন—ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর সততা ও নিষ্ঠা ছিল অনুকরণীয়। মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল প্রবাদতুল্য। তিনি কখনো সহকর্মীদের বাদ দিয়ে কোনো খাবারও গ্রহণ করতেন না। তাঁর জীবন যাপন ছিল অত্যন্ত আড়ম্বরহীন। পিতৃ-মাতৃ উভয়কুল বড় জমিদার হওয়া সত্ত্বেও এবং দীর্ঘদিন দেশের অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্ব থাকার পরও তাঁর কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না। তাঁর আত্মতাগ, সাহস আর জীবনসংগ্রাম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিত্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। আজ তার জীবন সংগ্রাম চর্চা করা জরুরী ।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular