ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeঅপরাধকাগজে শতভাগ কাজ, বাস্তবে নেই

কাগজে শতভাগ কাজ, বাস্তবে নেই

নিউজ ডেস্ক:  কাগজ-কলমে শতভাগ কাজ সম্পন্ন। ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে বরাদ্দের বিলও। তবে সরেজমিন দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। কোথাও আগের সিসি ঢালাই রাস্তার ছবি দেখিয়ে নতুন কাজের বিল করা হয়েছে; কবরস্থান সংস্কারের সামান্যতম চিহ্নও নেই। শুধু তাই নয়; একই সড়কের নাম সামান্য পরিবর্তন করে দ্বিগুণ বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পের (টিআর, কাবিখা ও কাবিটা) আড়ালে সরকারি অর্থ আত্মসাতের এমন অভিযোগে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রকল্পগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো অনিয়ম নয়; বরং একই ধরনের কৌশলে বরাদ্দ দেখিয়ে কাজ না করা, পুরোনো অবকাঠামোকে নতুন দেখানো এবং প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে অর্থ উত্তোলনের একটি চক্র কাজ করছে। তাদের দাবি, প্রতিটি প্রকল্পের জিপিএস লোকেশন, মাপ বই (এমবি), কাজের আগে ও পরে তোলা ছবি এবং ব্যাংক হিসাব যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হোক, যাতে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা উদ্ঘাটন করা যায়।

উপজেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচির আওতায় ১৪০টি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে থানাহাট ইউনিয়নে ৪৪টি প্রকল্পে প্রায় ৯৫ লাখ টাকা, রমনায় ২২ প্রকল্পে প্রায় ৫১ লাখ, রাণীগঞ্জে ১৮ প্রকল্পে প্রায় ৩৬ লাখ, নয়ারহাটে ২১ প্রকল্পে প্রায় ৪১ লাখ, অষ্টমীর চরে ১৮ প্রকল্পে ৪৯ লাখ এবং চিলমারী ইউনিয়নে ১২ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ৩৫ লাখ টাকা। গ্রামীণ সড়ক, কবরস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয় সংস্কারের কথা বলে এ অর্থ অনুমোদন করা হয়।

সরেজমিন দেখা যায়, থানাহাট ইউনিয়নের বজরা তবকপুর এলাকায় ‘ইউসুফ আলী মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি থেকে কালিরপাঠ মন্দির’ এবং ‘ইউসুফ মিলিটারীর বাড়ি থেকে আহম্মেদ আলী মিলিটারীর বাড়ি’– এ দুই প্রকল্পের অবস্থান প্রায় একই সড়কে। দুটি প্রকল্পে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে ওই সড়কে নতুন কোনো কাজ হয়নি। একই এলাকার মজাইডাঙা জামে মসজিদ-সংলগ্ন কবরস্থান সংস্কারে ৫ লাখ ৭০ হাজার ৫২৪ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়; কিন্তু সেখানে সংস্কারের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। আজমের বাড়ি থেকে আইয়ুবের বাড়িমুখী রাস্তা সংস্কারে ৫ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হলেও আগের করা সিসি ঢালাইকে নতুন কাজ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা কৃষ্ণ চন্দ্র, হরিশ চন্দ্র, বজলার রহমান ও তানিয়া খাতুন বলেন, বর্ষা এলে রাস্তাটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। অথচ একই রাস্তায় দুটি প্রকল্প দেখিয়ে বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। বাস্তবে কোনো উন্নয়ন হয়নি।

ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মাচাবান্দা এলাকায় ‘মেইন রাস্তা থেকে প্রিন্সের বাড়ি’ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের জন্য ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও সরেজমিন সেই রাস্তার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সেখানে যাতায়াতের জন্য মানুষ এখনও অন্যের উঠান ব্যবহার করেন। একই ওয়ার্ডের প্রামাণিকপাড়ায় পুকুরপাড়ে গাইডওয়াল নির্মাণের জন্য ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে শুধু পুরোনো ডেউটিন ও বাঁশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক গাড়ি মাটি ফেলার বাইরে কোনো কাজ হয়নি।

মাচাবান্দা কালামের চাতাল মেইন রোড থেকে ডিপঘর পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও স্থানীয় হামিদুল ইসলাম ও জয়নাল হক বলেন, ‘আগের ইউপি সদস্যের সময় কিছু মাটি কাটা হয়েছিল। এরপর আর কোনো উন্নয়ন হয়নি।’ ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট কুষ্টারী এলাকায় আব্দুল বারী সরকারের বাড়ি থেকে উমর হাজির বাড়ি পর্যন্ত সড়ক সংস্কারে ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই এইচবিবি প্রকল্পের কাজ চলমান ছিল। একই স্থানকে কাবিটা প্রকল্প দেখিয়ে আবার বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

এ ছাড়া মণ্ডলপাড়া থেকে আব্দুল কাইয়ুমের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ২ লাখ ৯ হাজার ১০০ টাকা এবং একই সড়ককে ভিন্ন নামে দেখিয়ে আরও ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সড়কটি আগে থেকেই সিসি ঢালাই ছিল। নতুন কোনো কাজ হয়নি। রমনা ইউনিয়নের রমনা সরকার বাড়ি আবদুল জব্বারের বাড়ি থেকে তুফানের বাড়িমুখী রাস্তা সংস্কারে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে চলতি অর্থবছরেই এডিবির আওতায় ওই রাস্তায় সিসি ঢালাইয়ের কাজ হয়েছে। সদ্য বদলি হওয়া উপজেলা প্রকৌশলী জুলফিকার আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

নয়ারহাট ইউনিয়নের খেরুয়ার চর ইমদাদুলের বাড়ি থেকে পূর্বে ময়েনের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা উন্নয়ন ও সংস্কারে ২ লাখ ৭ হাজার ৪৬০ টাকা এবং উত্তর খাউরিয়ারচরের তছরের বাড়ি-সংলগ্ন রাস্তা সংস্কার ও উন্নয়নে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কোনো কাজ না করেই সমুদয় টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পের কয়েকটিতে নামমাত্র কাজ দেখানো হয়েছে। আবার কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন না করেই কাগজে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বরাদ্দের অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে উপজেলার অন্যান্য প্রকল্পেও কাজের সঙ্গে বরাদ্দের সামঞ্জস্য নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রকল্পের নাম, বরাদ্দ ও সভাপতিদের তালিকা চাইলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের কর্মচারীরা জানান, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সোহেল রহমানের অনুমতি ছাড়া তা দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি অসুস্থতাজনিত কারণে বর্তমানে ছুটিতে। তাঁর অবর্তমানে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আতাউর রহমান দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি জানান, ‘আমি সবে দায়িত্ব নিয়েছি। অফিসে বসলেই এ বিষয়ে বলতে পারব।

ইউএনও মাহমুদুল হাসান বলেন, অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে।’ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এটিএম বেনজীর রহমান বলেন, ‘অনিয়মের ছবি তুলে পত্রিকায় ছাপান।

আরো খবর
Continue to the category
- Advertisment -spot_img

Most Popular