নিউজ ডেস্ক : নয়টি বৈঠক ও নয় কার্যদিবসের কার্যক্রম শেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন সমাপ্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জারি করা অধিবেশন সমাপ্তির আদেশ সংসদে পড়ে শোনানোর মাধ্যমে অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। ২৭ আগস্ট শুরু হওয়া এ অধিবেশনে উত্থাপিত ছয়টি বিলই পাস হয়েছে।
অধিবেশনের শেষ দিনে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সমাপনী বক্তব্য দেন। এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্য রাখেন। স্পিকার তাঁর সমাপনী বক্তব্যে সংসদীয় গণতন্ত্রে মতপার্থক্যকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে ভিন্নমত প্রকাশের সময় সংসদ সদস্যদের পারস্পরিক সম্মান ও সৌহার্দ্য বজায় রাখার আহ্বান জানান।
নয় বৈঠকে ছয় বিল পাস
তৃতীয় অধিবেশনে মোট ছয়টি বিল সংসদে উত্থাপিত হয় এবং সবগুলোই পাস হয়েছে। অধিবেশনের বিভিন্ন দিনে মানবাধিকার সুরক্ষা, জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, সম্পত্তি হস্তান্তর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামো এবং তদন্ত ক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
এর মধ্যে ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬; জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬ এবং সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস হয়। এসব আইনের মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশনের নতুন কাঠামো, জোরপূর্বক গুমের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আজীবন ভোগদখলের অধিকারসংক্রান্ত বিধান যুক্ত হয়েছে।
অধিবেশনের শেষ দিনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬ এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তদন্ত ক্ষমতা সম্প্রসারণসংক্রান্ত আরেকটি বিলও পাস হয়। এসব আইনের ফলে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন এসআরবি গঠনের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে এবং এপিবিএনের তদন্ত ক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
৩৫ সংসদীয় কমিটি গঠন-পুনর্গঠন
আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তৃতীয় অধিবেশনে সংসদীয় কমিটির কার্যক্রমও ছিল উল্লেখযোগ্য। স্পিকারের সমাপনী বক্তব্য অনুযায়ী, এ অধিবেশনে ৩৫টি সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন করা হয়েছে। এর বাইরে একটি বিশেষ কমিটিও পুনর্গঠন করা হয়।
এখানে উল্লেখ্য, অধিবেশন শেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মোট ৫০টি সংসদীয় কমিটির গঠন প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর আরও চারটি স্থায়ী কমিটি গঠনের মাধ্যমে এই সংখ্যা ৫০-এ পূর্ণ হয়। নতুন কমিটিগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, জনপ্রশাসন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানবিষয়ক কমিটি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের প্রশ্নের জবাব
সংসদীয় জবাবদিহির অংশ হিসেবেও তৃতীয় অধিবেশনে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম হয়েছে। স্পিকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীকে উত্তর দেওয়ার জন্য সংসদ সদস্যরা মোট ১৪৪টি প্রশ্নের নোটিশ দেন। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের উত্তর দেওয়ার জন্য সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে মোট ২ হাজার ৬৭৬টি প্রশ্ন জমা পড়ে। অধিবেশন চলাকালে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা এর মধ্যে ১ হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নের উত্তর দেন। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের কাছে জমা পড়া মোট ২ হাজার ৮২০টি প্রশ্নের মধ্যে ১ হাজার ৬৯৩টির উত্তর পাওয়া গেছে।
নোটিশ ও সংসদীয় কার্যক্রম
তৃতীয় অধিবেশনে বিভিন্ন সংসদীয় বিধির আওতায় সদস্যরা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে নোটিশ দেন এবং সেগুলোর ওপর আলোচনা হয়। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় সংসদীয় আলোচনায় উঠে আসার পাশাপাশি আইন প্রণয়ন ও কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংসদের নিয়মিত কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সংসদের সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্যেও দেখা যায়, তৃতীয় অধিবেশনের শেষ বৈঠক ১০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা নির্ধারিত ছিল এবং ২৭ আগস্ট থেকে এ অধিবেশনের ধারাবাহিক কার্যক্রম চলে।
মতপার্থক্যের মধ্যেও সংসদীয় কার্যক্রম
সমাপনী বক্তব্যে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থায় মতপার্থক্য স্বাভাবিক। তবে ভিন্নমত প্রকাশের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা ও সৌহার্দ্য বজায় রাখা জরুরি। তাঁর মতে, সংসদীয় কার্যপ্রণালি অনুসরণ করে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো সংসদ সদস্যদের সম্মিলিত দায়িত্ব।-
সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন ছিল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত হলেও আইন প্রণয়ন, সংসদীয় কমিটি গঠন-পুনর্গঠন এবং প্রশ্নোত্তর পর্বে ব্যস্ত একটি অধিবেশন। নয় কার্যদিবসে ছয়টি বিল পাসের পাশাপাশি সংসদীয় কমিটির কাঠামো পূর্ণতা পাওয়ায় পরবর্তী অধিবেশনগুলোতে আইন প্রণয়ন, মন্ত্রণালয়গুলোর জবাবদিহি এবং সংসদীয় নজরদারি আরও কার্যকর হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।



