নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন-১/১-এর বর্তমান অথরাইজড অফিসার শেখ মুহাম্মদ এহসানুল ইমামকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ, সরকারি জমির ব্যবহার-সংক্রান্ত অনিয়ম এবং নির্মাণকাজে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের বিষয় নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর দীর্ঘ ১১ বছরের চাকরিজীবনে রাজউকের জোন-১, ২, ৩, ৫ ও ৭-এ দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা এবং প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান লঙ্ঘনে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। সরকারি খাসজমি রূপায়ণ হাউজিং এস্টেটকে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায়ও তাঁর নাম এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এহসানুল ইমামের দায়িত্ব পালনকালে স্থাপনা নির্মাণ ও ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম রয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে সরকারি খাসজমি, ভাওয়াল এস্টেটের সম্পত্তি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমির রেকর্ড ও মালিকানা যাচাই ছাড়াই ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও মামলার সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।
দুদকের মামলায় নাম, তবুও দায়িত্বে বহাল
অভিযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সরকারি খাসজমি রূপায়ণ হাউজিং এস্টেটকে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দুদকের দায়ের করা মামলায় এহসানুল ইমামকে আসামি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মামলায় কয়েকজন আসামি অব্যাহতি পেলেও তিনি অব্যাহতি পাননি বলে জানা গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় বা প্রশাসনিক পর্যায়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, উত্তরা এলাকায় রূপায়ণ সিটি-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগের পরও তাঁকে একই এলাকার দায়িত্বে রাখার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে মামলায় আসামি হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়; এ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই গুরুত্বপূর্ণ।
রূপায়ণ হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে জমি-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, এহসানুল ইমাম রাজউকের জোন-২-এর সহকারী অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০১৭ সালে রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে সরকারি খাসজমি, ভাওয়াল এস্টেটের সম্পত্তি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমি জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে।
মামলার এজাহার-সংক্রান্ত অভিযোগ অনুযায়ী
বিমানবন্দর এলাকায় প্রিয়াঙ্কা সিটি প্রকল্পের জন্য রূপায়ণ হাউজিংয়ের আবেদনের সঙ্গে দাখিল করা রেকর্ডপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়নি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভূমি সরেজমিনে পরিদর্শন না করে এবং জমির প্রকৃত মালিকানা যাচাই ছাড়াই ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র অনুমোদনের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ভূমি সংস্কার বোর্ডের অধীন কোডস অব ওয়ার্ডসের নামে খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তি এবং অভিযোগকারীদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির বিষয়ে যথাযথ যাচাই ছাড়াই অনুমোদন দেওয়ার মাধ্যমে অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। এ ঘটনায় যোগসাজশ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রিয়াঙ্কা সিটি নিয়ে প্রশ্ন
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তালিকায় অবৈধ ভবন হিসেবে প্রিয়াঙ্কা সিটির নাম অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও তদারকির ক্ষেত্রে অনিয়মের সুযোগে প্রকল্পটির কার্যক্রম এগিয়েছে। এ ক্ষেত্রে এহসানুল ইমামের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অনুমোদনপত্র, ভূমির রেকর্ড, রাজউকের নথি এবং দুদকের মামলার এজাহার ও তদন্তের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ‘ভীষণ ৭১’ এর বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ
এদিকে রাজধানীর উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৩ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় রাজউকের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও একটি বহুতল আবাসিক ভবনের নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখার অভিযোগ উঠেছে। ‘ভীষণ ৭১’ নামের একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের নির্মাণাধীন ভবনকে ঘিরে এ অভিযোগ সামনে এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজউকের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ভবনটির নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হয়েছে এবং দিনের পাশাপাশি রাতেও কাজ চলছে। এ বিষয়ে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তাঁরা। কিন্তু এরপরও নির্মাণকাজ বন্ধে দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।
উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের রাজউক জোন-১/১-এর আওতাধীন চণ্ডালভোগ (খালপাড়) ব্রিজসংলগ্ন সড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত ভবনটি নিয়ে আগে থেকেই বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে থাকলে সেটি কার্যকর হচ্ছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে রাজউকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের ভাষ্য, রাজউকের নিয়মনীতি ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় ভবনটির নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাঁদের প্রশ্ন, একাধিকবার অভিযোগ জানানো এবং গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরও যদি নির্মাণকাজ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী?
তবে ভবনটির নির্মাণকাজের অনুমোদন, নিষেধাজ্ঞার প্রকৃতি, বর্তমান আইনি অবস্থা এবং রাজউক কর্তৃপক্ষের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
এ বিষয়ে রাজউকের সংশ্লিষ্ট অথরাইজড অফিসার (১/১) শেখ মুহাম্মদ এহসানুল ইমামের বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।




