ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeঅপরাধপুরোনো ভিডিও, ভুয়া মন্তব্য এবং ভিন্ন দেশের ঘটনা: ৪৪টি অপতথ্য

পুরোনো ভিডিও, ভুয়া মন্তব্য এবং ভিন্ন দেশের ঘটনা: ৪৪টি অপতথ্য

এ বছর দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পুরোনো ভিডিও, ভুয়া মন্তব্য এবং ভিন্ন দেশের ঘটনাকে বাংলাদেশের ঘটনা বলে প্রচারের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে অন্তত ৪৪টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার প্রায় ৬১ শতাংশেই ব্যবহার করা হয়েছে পুরোনো ভিডিও। এসব অপতথ্যের প্রায় ৫০ শতাংশের উৎস ভারত থেকে পরিচালিত বিভিন্ন প্রোফাইল ও পেজ। বিপরীতে, বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত প্রোফাইল ও পেজের অংশ প্রায় সাড়ে ৪৮ শতাংশ।

এ ছাড়া, পূজাকে ঘিরে ছড়ানো অপতথ্য শনাক্ত ও জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো বিশেষ লাইভ আপডেট চালু করে রিউমর স্ক্যানার। ১৬ থেকে ২২ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত সক্রিয় থাকা এই আপডেটে ৪১টি অপতথ্য যুক্ত হয়।

অপতথ্য শনাক্ত ৪৪ ভিডিওর মাধ্যমে অপপ্রচার ৬১% অপতথ্যে ভারতীয় উৎস ৫০% অপতথ্যে বাংলাদেশি উৎস ৪৮.৫% ভারতীয় গণমাধ্যমের সম্পৃক্ততা

১) অন্যের ছবি ব্যবহার করে ফেক আইডিতে প্রোপাগান্ডা
২) জেনেশুনেই সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচার করেছে কেউ কেউ
৩) পুরোনো অপতথ্য প্রচারকদের পুনরায় তৎপরতার প্রমাণ

এ বছর দুর্গাপূজাকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ছড়াতে শুরু করে গত সেপ্টেম্বর থেকেই। মাসের শেষ দিকে ভারতীয় কয়েকটি প্রোফাইল থেকে মিছিলের একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়, ‘বাংলাদেশের হিন্দুদের পূজা না করার জন্য প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে’। তবে রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিডিওটি ২০২৪ সালের। সে সময় উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের পরিবর্তে ১৭ নম্বর সেক্টরে সরকার বরাদ্দ দেওয়া জায়গায় পূজা আয়োজন করার দাবিতে এলাকাবাসী একটি মিছিল করেন। প্রচারিত ভিডিওটি ওই ঘটনারই।

এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্গাপূজাকে ঘিরে অপতথ্য প্রচারের প্রবণতা বাড়তে থাকে, যা পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর পর আরও তীব্র হয়। এ বছর দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে অন্তত ৪৪টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এসব অপতথ্যের প্রায় ৫০ শতাংশের উৎস ভারত থেকে পরিচালিত বিভিন্ন প্রোফাইল ও পেজ। এসব উৎসের মধ্যে অন্তত একটিতে ভারতীয় গণমাধ্যম ‘রিপাবলিক বাংলা’র সম্পৃক্ততাও পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, শনাক্ত হওয়া অপতথ্যগুলোর প্রায় সাড়ে ৪৮ শতাংশের উৎস বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত বিভিন্ন প্রোফাইল ও পেজ। সাম্প্রদায়িক না হলেও বাংলাদেশি একটি গণমাধ্যমে পূজা সংক্রান্ত এআই ছবি প্রচার করা হয়েছে।

অপতথ্যগুলোর ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর প্রায় ৬১ শতাংশই পুরোনো বিভিন্ন সময়ের বাংলাদেশ ও ভারতের ভিডিও ব্যবহার করে ছড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশের ঘটনা দাবি করে প্রচারিত অন্তত পাঁচটি ভিডিও যাচাই করে দেখা গেছে, সেগুলো মূলত ভারতের বিভিন্ন ঘটনার। বিপরীতে, বাংলাদেশের ঘটনার ভিডিও ভারতের বলে প্রচার করা হয়েছে একটি ক্ষেত্রে। এ ছাড়া, পাকিস্তানের একটি ঘটনাকেও বাংলাদেশের ঘটনা বলে প্রচার করা হয়েছে।

বাংলাদেশে মন্দির ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পূজা আয়োজনে বাধা দেওয়ার মতো বিভিন্ন দাবিতে ছড়ানো এসব অপতথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘটনাগুলো ছিল সাজানো, কোনোটি ছিল ছিনতাইয়ের ঘটনা, আবার কোনোটি বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড। কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন স্থাপনাকে মন্দির বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনের আগেই ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রং দিয়ে প্রচারের প্রবণতাও দেখা গেছে।

বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টকে কেন্দ্র করে অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৪ সালের আন্দোলন, ডাকসু নির্বাচন ও ২০২৬ সালের নির্বাচনসহ বিভিন্ন বড় ইভেন্টে অপতথ্য শনাক্ত ও জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে লাইভ আপডেট চালু রেখেছিল রিউমর স্ক্যানার। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল, বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার কমানোর পাশাপাশি মানুষকে সময়মতো সঠিক তথ্য জানানো।

এরই ধারাবাহিকতায় এবার দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য নিয়েও লাইভ আপডেট প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি। রিউমর স্ক্যানারের বিবেচনায়, বাংলাদেশসহ দেশের বাইরের কোনো ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে এমন উদ্যোগ নেওয়ার নজির নেই।

গত ১৬ অক্টোবর, মহাষষ্ঠীর দিন এই লাইভ আপডেট চালু করা হয়, যা মহাদশমীর পরদিন ২২ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। এ সময়ে মোট ৪১টি অপতথ্য শনাক্ত করে লাইভ আপডেটে হালনাগাদ করা হয়। পাশাপাশি, গুরুত্ব বিবেচনায় শনাক্ত হওয়া অপতথ্যগুলোর কয়েকটি রিউমর স্ক্যানারের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপেও নিয়মিত প্রচার করা হয়েছে।

দুর্গাপূজাকে ঘিরে অপতথ্য শুধু মানুষকে বিভ্রান্তই করে না, বরং ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে অবিশ্বাস ও উত্তেজনা তৈরির ঝুঁকিও বাড়ায়। এ পরিস্থিতিতে অপতথ্যের উৎস, প্রচারকৌশল ও প্রকৃত ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করার পাশাপাশি যাচাই করা তথ্য মানুষের কাছে সময়মতো পৌঁছে দেওয়া জরুরি। দুর্গাপূজায় রিউমর স্ক্যানারের বিশেষ লাইভ আপডেট উদ্যোগ সেই প্রচেষ্টারই অংশ, যার মাধ্যমে উৎসব চলাকালে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য শনাক্ত ও জনসচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।

এবার দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও দলকে জড়িয়ে ছড়িয়েছে নানা অপতথ্য। ১৯ থেকে ২১ অক্টোবরের মধ্যে এমন ছয়টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এসব অপতথ্যের কোনো কোনোটিতে সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের, আবার কোনোটিতে বিরোধী দলসংশ্লিষ্টদের জড়ানো হয়েছে। ভুয়া মন্তব্য প্রচার, ভিন্ন ঘটনার ভিডিওকে পূজা উদযাপনের দৃশ্য হিসেবে উপস্থাপন এবং একটি নিখোঁজ কিশোরীর ঘটনাকে রাজনৈতিক বয়ানে ব্যবহারের মতো প্রবণতা দেখা গেছে এসব অপতথ্যে।

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর “নবী-রাসূল নয়, দেব-দেবীরাই পৃথিবী থেকে অন্যায় দূর করেছেন”- এমন মন্তব্য করেছেন দাবি করে বেশ কিছু পোস্ট ছড়ানো হয়। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি। গত ১৮ অক্টোবর ঢাকার রমনা কালীমন্দিরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্যে তিনি মূলত দেবী দুর্গার আবির্ভাব, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং অসুরের পরাজয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

একইভাবে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের “দুর্গাপূজা শুধু হিন্দুদের নয়, এটি আমাদেরও উৎসব”- এমন মন্তব্য করেছেন দাবি করে পোস্ট প্রচার করা হয়। তবে যাচাইয়ে দাবিটির সত্যতা পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি মসজিদের মিম্বরে বসে দুর্গাপূজা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন দাবি করে একটি ভিডিও ছড়ানো হয়। রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিডিওটি বিভ্রান্তিকরভাবে সম্পাদনা করে প্রচার করা হয়েছে। গত ১৯ অক্টোবর লক্ষ্মীপুরের চৌপল্লী বারাহী মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় তিনি “অন্যায়ের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিল” বলে মন্তব্য করেন। তার সেই বক্তব্যের অডিও মসজিদে ধারণ করা ভিন্ন একটি ভিডিওতে যুক্ত করে প্রচার করা হয়।

এদিকে, আওয়ামী লীগের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে দাবি করা হয়, পূজামণ্ডপে গিয়ে এক কিশোরী নিখোঁজ হয়েছে এবং বিএনপি-জামায়াতের আমলে সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীন। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, পূজা দেখতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া কিশোরীকে সিলেটে তার পিসির বাড়িতে পাওয়া গেছে। পুলিশ জানায়, বাবার সঙ্গে রাগ করে সে সেখানে চলে গিয়েছিল এবং সে সুস্থ আছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সরকারবিহীন পরবর্তী তিন দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক হামলার ঘটনা ঘটে। হত্যা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অসংখ্য খবর প্রকাশ্যে আসে। হামলার শিকার হয় বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের বাড়িঘর ও স্থাপনাও। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য। ওই সময় এক সপ্তাহ ধরে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে এক্সে এমন ৫০টি অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে রিউমর স্ক্যানারের ইনভেস্টিগেশন ইউনিট, যেগুলো থেকে বাংলাদেশের তৎকালীন ঘটনাবলির বিভিন্ন ছবি, ভিডিও ও তথ্যকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে প্রচার করা হচ্ছিল। শনাক্ত করা প্রতিটি অ্যাকাউন্টের অন্তত একটি পোস্টে সাম্প্রদায়িক ভুল তথ্য বা অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পায় রিউমর স্ক্যানার। এসব অ্যাকাউন্টের একটি ছিল Jitendra Pratap Singh। ২০১২ সালে চালু হওয়া এই প্রোফাইল থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে এখনও অপপ্রচার চালানো হয়। এবারের দুর্গাপূজার সময়ও বাংলাদেশকে ঘিরে সক্রিয় ছিল প্রোফাইলটি।

গত ১৯ অক্টোবর প্রোফাইলটি থেকে ফজলুল হক আমিনী নামের এক ব্যক্তির ছবি প্রকাশ করে দাবি করা হয়, তিনি বাংলাদেশে দুর্গাপূজার মণ্ডপ ও হিন্দু মন্দিরে ভাঙচুরের ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে আসল ঘটনা হলো, সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় প্রধান আসামি হওয়ার প্রেক্ষিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

দীর্ঘদিন ধরে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের জন্য পরিচিত আরেকটি ভারতীয় এক্স প্রোফাইল Pakistan Untold। ২০২৫ সাল থেকে এই প্রোফাইলের মাধ্যমে বাংলাদেশকে জড়িয়ে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ রয়েছে রিউমর স্ক্যানারের কাছে। এবারের দুর্গাপূজার সময়ও প্রোফাইলটি থেকে অন্তত পাঁচটি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।

২০২৪ সাল থেকেই বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় একাধিক এক্স প্রোফাইল থেকে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের প্রবণতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে আসছে রিউমর স্ক্যানার। এ ধরনের আরেকটি প্রোফাইল Kreately.in। এবারের দুর্গাপূজার সময় এই প্রোফাইল থেকেও অন্তত দুটি অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার।

এ বছর দুর্গাপূজার সময়ে রিউমর স্ক্যানারের নজরে আসে ভারতীয় ‘Sum Ami’ নামের একটি প্রোফাইলের কার্যক্রম। প্রোফাইলটি থেকে বাংলা ক্যাপশনে নিয়মিত বাংলাদেশের বিভিন্ন ভিডিও প্রচার করা হচ্ছিল। এসব ভিডিওর মাধ্যমে মূলত ‘বাংলাদেশে হিন্দুরা ভালো নেই, তারা নিয়মিত নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন’—এমন একটি বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা গেছে। এর মধ্যে ১৭ থেকে ১৯ অক্টোবরের মধ্যে প্রোফাইলটি থেকে প্রচারিত তিনটি ভিডিওতে অপতথ্য ছড়ানোর প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার।

বাংলাদেশ ও ভারতে সঠিক তথ্য জানা থাকা সত্ত্বেও অপতথ্য ছড়ানোর অপচেষ্টার প্রমাণ এর আগেও বহুবার পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বা প্রোফাইলগুলোকে সঠিক তথ্য জানানোর পরও অনেক ক্ষেত্রে অপতথ্যপূর্ণ পোস্ট সরিয়ে নেওয়া হয়নি। এবারও এমনই একটি ঘটনার প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার।

গত ১৭ অক্টোবর ‘আবারো বাংলাদেশের হিন্দুদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে’ ক্যাপশনে একটি ভিডিও প্রচার করে Sum Ami প্রোফাইলটি। ভিডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ‘Jibon Vai’ নামের একটি পেজে এর মূল ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ওই ভিডিওর ঘটনার সঙ্গে সাম্প্রদায়িক কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

মূলত, ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় আসামিদের গ্রেপ্তার ও দ্রুত বিচারের দাবিতে গ্রামবাসী মানববন্ধন করেন। এর পর উত্তেজিত জনতা অভিযুক্তদের (শরিফ, আরিফ, রাজিব, ফাহিম ও এনামুল) বসতবাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। অভিযুক্তরা সবাই মুসলিম। অর্থাৎ, ঘটনাটি হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার নয়; বরং ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাড়িতে হামলার ঘটনা।

এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মূল ভিডিওটিতে ‘Sum Ami’ প্রোফাইলের ‘Like’ রিয়্যাকশন দেখা গেছে। অর্থাৎ, মূল ঘটনার বিবরণসংবলিত ক্যাপশনে ভিডিওটি প্রোফাইলটির নজরে এসেছিল। তা সত্ত্বেও ভিডিওটি ভিন্ন ক্যাপশনে প্রচার করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সঠিক তথ্য জানা থাকা সত্ত্বেও ভিন্ন বয়ানে একই ভিডিও প্রচারের এ ঘটনা বাংলাদেশ ও ভারতে অপতথ্য ছড়ানোর পূর্ববর্তী প্রবণতারই আরেকটি উদাহরণ। মূল ঘটনার তথ্যসংবলিত পোস্টে প্রোফাইলটির প্রতিক্রিয়া থাকার বিষয়টি সঠিক তথ্য জানা সত্ত্বেও সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের অপচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে সামনে এসেছে।

দুর্গাপূজা ঘিরে একের পর এক সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক পোস্ট প্রচার করছিল ‘সিমা চক্রবর্তী’ নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল। গত ২০ অক্টোবর প্রকাশিত একটি পোস্টে পূজামণ্ডপে মুসলিম দর্শনার্থীদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, যা ঘিরে ব্যাপক সমালোচনা হয়।

দুর্গাপূজা শুরুর পর থেকে প্রোফাইলটি ধর্মীয় উসকানিমূলক একাধিক পোস্ট প্রকাশ করে। প্রোফাইলের পরিচয়সংক্রান্ত দাবিগুলো যাচাই করে দেখা যায়, এর পরিচালনাকারী নিজেকে সিমা চক্রবর্তী নামে পরিচয় দিলেও ব্যবহৃত ছবির নারী বাংলাদেশের নন। ছবিগুলো মূলত ভারতীয় নারী নিতু যাদবের, যার পাশাপাশি তার স্বামী ও সন্তানের ছবিও প্রোফাইলটিতে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সহায়তায় সামান্য সম্পাদনা করে ভুয়া পরিচয় তৈরি করা হয়েছে।

এ ছাড়া, প্রোফাইলে নিজের সন্তান পরিচয়ে প্রকাশিত একটি ছবির স্কুলের নাম যাচাই করে বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট কোনো বিদ্যালয়ের সন্ধান পাওয়া যায়নি। একটি এআই ডিটেক্টরও ছবিটি এআই দিয়ে তৈরির উচ্চ সম্ভাবনা দেখিয়েছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করা প্রোফাইলটিতে এক মাসের মধ্যে প্রায় নয় হাজার অনুসারী যুক্ত হয়। বর্তমানে প্রোফাইলটি আর সক্রিয় নেই।

আরো খবর
Continue to the category
- Advertisment -spot_img

Most Popular