ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeলিডপ্রকৌশল শিক্ষার্থীদের শাটডাউনের ডাক

প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের শাটডাউনের ডাক

তিন দফা দাবি আদায়ে আন্দোলনরত প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গতকাল পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। শিক্ষার্থীরা রাজধানীর শাহবাগ থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও জলকামান ব্যবহার করে। এক পর্যায়ে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এলাকায় তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। এতে গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েন লোকজন।

পুলিশের ‘হামলা’র প্রতিবাদে আজ বৃহস্পতিবার দেশের সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলন।
গতকাল রাতে শিক্ষার্থীদের ১১ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বৈঠক কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। আজ তারা আবার আলোচনায় বসবেন।

ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের নামের আগে ‘প্রকৌশলী’ লিখতে না দেওয়াসহ তিন দাবিতে আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে শাহবাগ মোড় হয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আশপাশের এলাকায়ও তীব্র যানজট দেখা দেয়। দুপুর দেড়টার দিকে শিক্ষার্থীরা পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ থেকে যমুনা ঘেরাও করতে রওনা হন। তখন পুলিশ বাধা দেয়। সংঘর্ষে অর্ধশত শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে আন্দোলনকারীরা জানান। আট পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর।

এর আগে মঙ্গলবার বিকেলে তিন দফা দাবিতে শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যার দিকে তারা ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করে সেদিনের মতো আন্দোলনের সমাপ্তি টানেন। গতকাল সকালে প্রথমে বুয়েট ক্যাম্পাসে জড়ো হন তারা। বুয়েটের প্রধান গেটের সামনের শহীদ মিনার এলাকা থেকে এ কর্মসূচি শুরু হয়। পরে মিছিল নিয়ে এসে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। দুপুর দেড়টার দিকে শিক্ষার্থীরা শাহবাগ থেকে মিছিল নিয়ে যমুনার দিকে রওনা হন।

দুপুরে সরকার তাদের দাবির বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে। তবে সেটি অনুপযুক্ত দাবি করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা। তাদের তিন দাবি– ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের নামের আগে ‘প্রকৌশলী’ উপাধি ব্যবহার বন্ধ, কাউকে পদোন্নতি দিয়ে নবম গ্রেডে উন্নীত না করা এবং

দশম গ্রেডে চাকরিক্ষেত্রে স্নাতক প্রকৌশলীদের যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ দেওয়া। রাত ৮টায় শাহবাগ মোড়ে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীরা এই তিন দফার সঙ্গে আরও তিন দাবি যুক্ত করেন। সেগুলো হলো– সরকার গঠিত ‘অনুপযুক্ত’ কমিটি পুনর্গঠন; শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করায় পুলিশের উপকমিশনারকে ক্ষমা প্রার্থনা এবং সংশ্লিষ্ট তিন উপদেষ্টাকে শাহবাগে আসতে হবে। এর আগে বিকেলে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা তাদের ওপর ‘হামলা’ চালানোয় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে ক্ষমা চাওয়ারও দাবি জানান। সন্ধ্যার দিকে শাহবাগ মোড়ে আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য ‘প্রতীকী জানাজা’ পড়েন।

যানজটে ভোগান্তি

শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড় অবরোধ করায় রাজধানীজুড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এতে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েন বিভিন্ন গন্তব্যের মানুষ। দুপুরে পল্টন, কাকরাইল, মৎস্য ভবন, রাজু ভাস্কর্য, নীলক্ষেত, কাঁটাবন, কারওয়ান বাজার ও মগবাজার এলাকায় ঘুরে দেখা যায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি। বেশি ভোগান্তিতে পড়েন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বারডেম হাসপাতালের উদ্দেশে আসা রোগীরা।

ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ডাক

আজ বৃহস্পতিবার দেশের সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের সভাপতি ওয়ালী উল্লাহ। তিনি জানান, তাদের দাবি মানা না হলে আজ বিকেল ৫টায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। রাত সাড়ে ১০টায় ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণার পর শাহবাগ ছেড়ে যান আন্দোলনকারীরা।

দুঃখপ্রকাশ ডিএমপির

গতকাল রাত ১০টার দিকে শাহবাগ মোড়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে উপস্থিত হয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। এ ঘটনায় আজ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলে তিনি জানান। এ সময় শিক্ষার্থীরা পুলিশের ডিসি মাসুদের বহিষ্কারের দাবি জানান। ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্যের পর শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ডিএমপি কমিশনার এসে শিক্ষার্থীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করার আগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ১১ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বৈঠক শেষে ফাওজুল কবির বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত। এ জন্য ক্ষমা চাইবেন পুলিশের প্রতিনিধি।’ আলোচনার জন্য সরকারের দরজা খোলা রয়েছে জানিয়ে ফাওজুল কবির খান আরও বলেন, ‘কথায় কথায় যমুনা অভিমুখে যাত্রা অনভিপ্রেত।’

সরকার গঠিত কমিটি বাতিলের দাবি

‎প্রকৌশল পেশায় বিএসসি ডিগ্রিধারী ও ডিপ্লোমাধারীদের পেশাগত দাবিগুলোর যৌক্তিকতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য কমিটি গঠন করেছে সরকার। তবে কমিটি অনুপযুক্ত বলে দাবি করে নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। কমিটি গঠন করে বুধবার প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। কমিটির সভাপতি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের সভাপতি ওয়ালী উল্লাহ বলেন, সরকার যে কমিটি করেছে, সেটিতে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) প্রেসিডেন্টকেও রাখা হয়েছে। ‎এ জন্য এ কমিটি অনুপযুক্ত।

জনপ্রশাসন সচিবের বক্তব্য

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোখলেস উর রহমান বলেন, আন্দোলনরত প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রস্তাব দিলে সচিব কমিটি তাদের সমস্যা সমাধান করবে। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। আন্দোলনকারীদের দাবি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এর সঙ্গে সরকারি কর্ম কমিশন, জনপ্রশাসন, মন্ত্রিপরিষদ, লেজিসলেটিভ বিভাগ জড়িত। এ ছাড়া প্রকৌশলীরা যেসব মন্ত্রণালয়ে চাকরি করছেন, সেগুলোও জড়িত। সবার সঙ্গে বসে সমাধান করতে হবে।

লাঠিচার্জ করায় বুয়েট উপাচার্যের নিন্দা

আন্দোলনরত প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু বোরহান মোহাম্মদ বদরুজ্জামান। গতকাল সন্ধ্যায় শাহবাগে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে তিনি বলেন, দাবি জানাতে যমুনায় যাওয়ার সময় পুলিশ নির্মমভাবে লাঠিচার্জ করেছে। সভ্য সমাজে এটা কোনোভাবে কাম্য নয়। জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরসহ শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেছি। দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরেছি। দায়িত্ব নিয়ে উপদেষ্টাদের সঙ্গে বসে কমিটি গঠন করতে এবং বিষয়টির সমাধান করতে অনুরোধ করি। এর পরই কমিটি গঠন করা হয়েছে।’ এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘কমিটি মানি না’ বলে ওঠেন। পাশাপাশি ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন।

বুয়েট কর্তৃপক্ষের প্রতিবাদ

আন্দোলনরত প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে বুয়েট। বুধবার বুয়েটের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্বে) এনএম গোলাম জাকারিয়ার দেওয়া বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের বদলে পুলিশের এ ধরনের হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বুয়েট প্রশাসন পুলিশের এ আচরণে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ, মর্মাহত এবং এ হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। যথাযথ তদন্ত করে হামলার ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে বুয়েট প্রশাসন আশা করছে।

চুয়েট শিক্ষার্থীদের আন্দোলন

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, প্রকৌশল খাতে বৈষম্য দূরীকরণ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষার্থীরা। গতকাল বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর ২ নম্বর গেট এলাকায় এ কর্মসূচি চলার সময় অন্তর্বর্তী সরকারের মৃত্যুর প্রতীকী গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের প্রতিবাদ

প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র-শিক্ষক-পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদ। বুধবার দুপুরে সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে তারা মিছিল করেছে। এ সময় তাদের লাঠিচার্জ করেছে পুলিশ। কাকরাইলে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনের রাস্তায় লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। আন্দোলনকারী ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন।

সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মো. আখেরুজ্জামান জানান, তাদের ৭ দফা দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ছিল। দুপুর ১২টায় তারা কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) থেকে কর্মসূচি শুরু করেন। তারা মিছিল নিয়ে মগবাজার মোড়ে পৌঁছালে পুলিশ বাধা দেয়। পরে সংগ্রাম পরিষদের ১১ জন প্রতিনিধি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে গিয়ে স্মারকলিপি জমা দেন।

তাদের ৭ দফা দাবির মধ্যে আছে– প্রকৌশল কর্মক্ষেত্রে বিএসসি ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে ভাগ করতে হবে এবং উপসহকারী প্রকৌশলী পদ কেবল পলিটেকনিক ও মনোটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে উত্তীর্ণদের জন্য সংরক্ষণ রাখতে হবে। সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রকৌশল সংস্থা, বিভাগ ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি কোম্পানির জনবল কাঠামোয় বিএসসি ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অনুপাত ১:৫ নির্ধারণ করতে হবে। আখেরুজ্জামান জানান, প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের ব্যানারে করা তিনটি দাবির প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তারা।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular