মোঃ সাইদুর রহমান
ঔষধ কোম্পানি গুলো সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে ঔষধ উৎপাদন ও বিপণন করেন। ঔষধ মানুষের হাতের কাছে পৌঁছে দেওয়া অথবা ঔষধের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চিকিৎসকের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরী এবং প্রতিযোগিতামূলক বিষয়।
পেশায় বিচিত্রতা অস্বাভাবিক নয়, তবে মুক্তবাজার অর্থনীিতিতে সময়বিশেষে সাংঘর্ষিক। পেশার ধরণ, চলন, কার্যবিধি বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। তবে যে পেশা চ্যালেঞ্জিং, সে পেশা দক্ষ ও সংগ্রামী মানুষ তৈরী করে।
ঔষধ বিপণনে যুক্ত প্রতিনিধিরা সবাই দক্ষ নয়, কাজেই দক্ষতা এবং অদক্ষতা এ দুই কারণে আচরণে কেউ কেউ অস্বাভাবিকতা প্রত্যক্ষ করেন তবে তা দোষের নয়, তবে প্র্রতিযোগিতার মাধ্যমেই দক্ষ হয়ে উঠতে হয়। নয়তো ছিটকে পড়তে হয়।
ঔষধ খাত হলো রাষ্ট্রের জরুরী সেবা খাত। ঔষধ খাত অতি বর্ধনশীল একটি খাত। দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও ঔষধ রপ্তানি হচ্ছে। এই খাতে প্রতিবছর অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। ঔষধের সেবা মানুষের হাতের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কোম্পানি গুলো বিভিন্ন ধাপে লোক নিয়োগ দিয়ে থাকেন।
আধুনিক বিশ্বে সবই চলছে মুক্ত বাজার অর্থনীতির জয়জয়কার। টগবগে সুদর্শন যুবক ব্যাগ কাঁধে অথবা বাইকের পিছনে ব্যাগ ঝুলানো। ডাক্তারের চেম্বার, ক্লিনিক, হাসপাতালের আশেপাশে বেশ নম্র-ভদ্র ভাবে ঘুরাফেরা করেন।
প্রেসক্রিপশন দেখলেই অতি সাবধানতার সাথে এগিয়ে গিয়ে অপরাধী দৃষ্টিতে প্রেসক্রিপশনটায় কি ঔষধ ডাক্তার লিখেছেন দেখতে চায় অথবা ছবি তুলতে চায়। এই কাজটা এমন ভাবে করেন যাতে রোগী বিরক্ত বোধ না করেন। এই পেশাটা এমন একটা পেশা, কোন কর্মঘন্টা নাই।
সকাল ৮ থেকে শুরু রাত ১২ টায়ও অনেক সময় কাজ শেষ হয় না। সকাল ৮ টায় প্রথমে মগজ ধোলাই দিবে বসে, তখন শুধু শুনতে হবে। তারপর সারাদিন কেমিস্ট, ফার্মাসিস্ট, ঔষধের দোকানের একজন কর্মচারী, হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় সবাই তাকে চকলেটের মতো চুষে। অনেকেই আবার তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন । সারাদিন এত মানসিক চাপের মধ্যে নিজেকে প্রফুল্ল রাখতে হয়।কারন বিষন্নতা সেলস এর প্রতিপক্ষ। পারিবারিক অশান্তি, ঘরে বাজার নেই, বাসা ভাড়া জমে গেছে, তারপরও পরিপাটি এবং হাসি মুখে। একজন রিপ্রেজেন্টিভের মুখ ভরা হাসি সবাই দেখেন কিন্তু বুকফাটা আর্তনাদ অন্তরালেই থাকে।
তাঁরা উচ্চশিক্ষিত বেকার কিন্তু পথভ্রষ্ট নয়, তারা পরিবার কিংবা রাষ্ট্রের বোঝা হতে চায় না সাধারণত তারাই আসেন এ পেশায়। কোম্পানি কাছে যথেষ্ট যোগ্যতা, মেধার পরিচয় দিয়ে চাকরি নিতে হয়। তারপর মাসব্যাপী হয়, উচ্চমানের ট্রেনিং প্রতিদিনের পরীক্ষা। মাসান্তরে যারা সেই অদ্ভুত নিয়মকানুনের ট্রেনিং পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হবেন। তারা যাবেন ফিল্ড ট্রেনিং, সেখানে উর্ত্তীণ হলে তারপর কর্মস্থলে যোগদান।
৩ মাস চলবে চাকরি হালকা চাপে। ৩ মাস পর যে মার্কেটে ১ লাখ টাকা বিক্রি করা যাবে, সেখানে টার্গেট দিবে ২ লাখ টাকা। তারপর আছে, মার্কেটে আন্ডারপ্রাইজ । টার্গেটের পিছনে দৌড়াতে গিয়ে দিনকে রাত করতে হয়। পরিবার কিংবা সন্তানকে সময় দেওয়ার তেমন সুযোগ হয় না। কারন সকাল ৮ টায় যখন বের হন সন্তান তখন ঘুমে আর রাত বারোটা গিয়ে দেখেন সন্তান ঘুমে। যদিও দুপুরে মাঝে মধ্যে বাসায় যেতে পারেন তাও আবার ঘন্টা দুয়েকের জন্য।
সারা মাস ডাক্তার, হাসপাতাল, ফার্মেসীতে অক্লান্ত পরিশ্রম করার পরও টার্গেট হবে না কারণ টার্গেট যে ২ গুনেরও বেশি । কোম্পানির উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা বলবে টার্গেট অনুযায়ী বেতন, টিএ ডিএ নিতে হবে (বিভিন্ন নিয়ম বিভিন্ন কোম্পানিতে)। কোন প্রতিবাদ করলেই চাকরি চ্যুতি করার হুমকি। পরের দিন সকালে তার চাকরি থাকবে কিনা সেটা সময়ে বলে দিবে। মার্কেটে বাকী থাকলে অনেক কোম্পানী বেতন থেকে সমন্বয় করে দিচ্ছে তাও আবার মাস শেষে!
পরিসংখ্যান বলে বাংলাদেশে সরকার অনুমোদিত ঔষধ কোম্পানি আছে প্রায় ৮৫০টি, এ্যালোপ্যথিক কোম্পানি আছে ২৬৯ টি। সক্রিয় ভাবে উৎপাদনে আছে ২০০- ২৫০ টি কোম্পানি। ঔষধ শিল্পের অভ্যন্তরীন বাজার ১৩ হাজার কোটি টাকা, যা প্রবৃদ্ধির ৯ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে।
যার ফলে ঔষধ রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের ১৬০ টি দেশে। বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ঔষধ শিল্প থেকে আসে। গত অর্থবছরে ( ২৪-২৫) ঔষধ শিল্প থেকে বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে ২১৩ মিলিয়ন ডলার। ঔষধ শিল্প বর্তমানে কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান কর্মসংস্থান খাত। এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুই লক্ষ্যাধিক লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। সবচেয়ে বেশী মেডিকেল প্রমোশনার অফিসার ( MPO) বা রিপ্রেজেন্টেটিভ।
ঔষধ কোম্পানি গুলো সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে ঔষধ উৎপাদন ও বিপণন করেন। এখন কথা হলো, ঔষধ মানুষের হাতের কাছে পৌঁছে দেওয়া অথবা ঔষধের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চিকিৎসকের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরী কাজ। কাজেই ঘৃণার চোখে নয় সম্মানের চোখে দেখাটাই সমাজের জন্য ইতিবাচক।
লেখক ও কলামিস্ট




