• ঢাকা
  • রবিবার, ৩০ চৈত্র ১৪৩০ বঙ্গাব্দ; ১৪ এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image
website logo

একদিনের বাচ্চার সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: রবিবার, ৩১ মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ০৮:৪৬ পিএম
পুরোটাই করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে
একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা

নিউজ ডেস্ক:   পোলট্রি খাতে মাংস ও ডিমের জন্য সাধারণত একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা কেনেন খামারিরা। যেসব মোরগ-মুরগির মাধ্যমে বাচ্চা উৎপাদন হয়, সেগুলোকে বলা হয় ‘প্যারেন্ট স্টক’ (পিএস)। আর পিএস উৎপাদন হয় ‘গ্র্যান্ড প্যারেন্ট’ (জিপি) স্টক থেকে। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে হঠাৎ ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির একদিনের বাচ্চার সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে। এর মধ্যে বাজারে চাহিদাও বেশি। ফলে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০-৫০ শতাংশ বেশি টাকায় বাচ্চা কিনতে হচ্ছে খামারিদের। 

প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জিপি ও পিএসের বাজারের প্রায় পুরোটাই করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে। গত বছরের মে মাসে একদিনের বাচ্চার দাম ৫০-৫৩ টাকা নির্ধারণ করে দেয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এরপর সম্প্রতি আরেক দফায় ১০ টাকা বাড়িয়ে করা হয় ৬০-৬৩ টাকা। 

করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বাচ্চা সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক খামারিরা। কোথাও কোথাও বাচ্চা কিনতে হচ্ছে ৮৫-৯৫ টাকায়। এতে মাস খানেক পরে মুরগি ও ডিমের দাম বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। 

ফেনী ও চাঁদপুরের ডিলার ও খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডিলার পয়েন্টে প্রতিটি মুরগির বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে ৭৫-৮৫ টাকায়। কালোবাজারে দাম পড়ছে ৯০-৯৫ টাকা। ১০০ টাকা নেয়ার অভিযোগও আছে। খামারিরা বলছেন, সিন্ডিকেট করে মুরগির বাচ্চার সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানো হয়েছে। 

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার খামারি সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার ২০ হাজার বাচ্চা প্রয়োজন, ‍কিন্তু পাচ্ছি না। আজ (শনিবার) লেয়ারের বাচ্চা কিনতে চেয়েছি, ৮৪ টাকা করে চেয়েছে। এত দামের পরও ১০ হাজার পিস দিতে পারছে না।’ এ খামারি বলেন, ‘আমার যেহেতু খামার বড়, তাই কিছুটা কম দামে নিতে পারছি। যাদের খামার ছোট তাদের ৯০-৯৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে।’ 

প্রায় একই অবস্থা চাঁদপুরেও। সদর উপজেলার স্বপ্না এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের শামছুল ইসলাম বলেন, ‘ডিলারদের কাছে বাচ্চা পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু জায়গায় কথা বলেছি, অনেক দাম চায়। আমরা খামারিরা অসহায়।’

সদর উপজেলার ডিলার মো. সোলায়মান বলেন, ‘ব্রয়লারের বাচ্চা ৭৫ ও লেয়ারের বাচ্চা ৮০ টাকায় বিক্রি করছি। এর চেয়ে ২ টাকা কমে কিনতে হচ্ছে আমার। প্রতি সপ্তাহে আমার প্রায় ৫০ হাজার বাচ্চার চাহিদা রয়েছে। কিন্তু অর্ধেকও পাচ্ছি না। কোম্পানির বড় কর্মকর্তারা সিন্ডিকেট করে বাচ্চা বিক্রি করছেন।’ কোম্পানিগুলো থেকে রসিদ দেয়া হয় কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বাচ্চাই দিতে চায় না, রসিদ চাইলে বাচ্চা একেবারেই দেবে না।’ 

বগুড়ায় বেশকিছু হ্যাচারি রয়েছে, যেগুলোয় ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হয়। বাচ্চাগুলো বিক্রি হয় বগুড়া শহরের নামাজগড়ে। বাচ্চা কিনতে আসা ফারুক মিয়া বলেন, ‘আজ (শনিবার) ও গতকাল বাজারে বাচ্চার সরবরাহ নেই।’

বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘বগুড়ায় মুরগির বাচ্চার কমতি নেই। নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। যারা মুরগির বাচ্চা নিয়ে বাজার অস্থিতিশীল করবে, তাদের ছাড় দেয়া হবে না।’

এক মাসের বেশি সময় ধরে লেয়ার মুরগির বাচ্চা না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেন রংপুর জেলা পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি এবং লিংকন পোলট্রি ফার্মের প্রোপ্রাইটর মো. আরমানুর রহমান লিংকন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডিলারের কাছে ২ হাজার ডিম পাড়া (লেয়ার) মুরগির বাচ্চা অর্ডার দিয়ে এক মাসেও পাইনি। হ্যাচারিতেই বাচ্চার সংকট বলে জানানো হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘কোনো কোনো ডিলার মুরগির বাচ্চার সঙ্গে পোলট্রি ফিড কেনার শর্ত জুড়ে দিচ্ছে।’ 

ম্পদ কর্মকর্তা ডা. এনামুল হক বলেন, ‘‌সরকার নির্ধারিত দামের বাইরে মুরগির বাচ্চা বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে বাচ্চা সরবরাহ না থাকলে সেটা ভিন্ন কথা।’

পোলট্রি খাতের বেসরকারি সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি সপ্তাহে একদিন বয়সী বাচ্চার চাহিদা প্রায় দুই কোটি। এর মধ্যে ব্রয়লার বাচ্চার চাহিদা দেড় কোটি, লেয়ার (বাদামি ও সাদা) ৯-১০ লাখ, সোনালি ১৮-২০ লাখ ও কালার বার্ড ১৫-১৮ লাখ। ব্রয়লার মুরগি বাজারে বিক্রির উপযোগী হতে মাস খানেক সময় লাগে। ফলে মাস খানেকের মধ্যে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির মাংস এখন বিক্রি হচ্ছে ২২০-২৪০ টাকায়।

পোলট্রি বাজারে বর্তমানে যে কয়টি প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবশালী হিসেবে দেখা হয় সেগুলোর মধ্যে হলো কাজী ফার্মস গ্রুপ, নারিশ, প্যারাগন, আফতাব, কোয়ালিটি, প্রোভিটা, সিপি, ডায়মন্ড এগ, রাশিক/জামান গ্রুপ ইত্যাদি। এর মধ্যে ব্রয়লারের জিপি স্টকের ৮৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির হাতে।

ঢাকার নেদারল্যান্ডস দূতাবাস দেশের পোলট্রি খাতে করপোরেটগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক গবেষণা চালায়। ২০২০ সালে প্রকাশিত ‘পোলট্রি সেক্টর স্টাডি বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসে, দেশে ব্রয়লার মুরগির জিপি স্টক সবচেয়ে বেশি রয়েছে কাজী ফার্মস গ্রুপের, ৪৯ হাজার। এছাড়া সিপি বাংলাদেশের ২৪ হাজার, নারিশ ফার্মসের ২২ হাজার ৫০০, আফতাব হ্যাচারির ১২ হাজার ও প্যারাগনের রয়েছে ১৪ হাজার।

প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মুরগির বাচ্চার দাম এখন ৯০-১০০ টাকা। কিন্তু এ বাচ্চার উৎপাদন খরচ ২৫-৩০ টাকা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কিসের ভিত্তিতে ৬০-৬৩ টাকা নির্ধারণ করে দিল, আমার জানা নেই। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তি সুবিধা দিতে এ দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন তারা সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে আরো টাকা লুটপাট করছে। প্রান্তিক খামারিদের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সুরক্ষা দিতে পারছে না। আগামী মে-জুনে মুরগি ও ডিমের দাম এ কারণে বেড়ে যাবে।’

সুমন হাওলাদার বলেন, ‘করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রান্তিক পর্যায়ে বাচ্চা না দিলেও তাদের চুক্তিবদ্ধ ফার্মগুলোয় ঠিকই দিচ্ছে। কারণ চুক্তিভিত্তিক ফার্মগুলোর মাংস ও ডিমের দাম তাদের নিয়ন্ত্রণে। প্রান্তিক খামারিরা যেন বাজারে টিকতে না পারে, সেজন্য তারা বিভিন্ন ফার্মকে চুক্তির আওতায় নিয়ে আসে।

ঢাকানিউজ২৪.কম / এইচ

আরো পড়ুন

banner image
banner image